বাংলা সাহিত্যে নায়িকাদের আভূষণ
লিখেছেন আইভি চ্যাটার্জী   

আভূষণ অর্থাৎ অলঙ্কার। অলঙ্কারশাস্ত্রের কথা বললেই সংস্কৃত সাহিত্যের কথা মনে আসে। ভারতের নাট্যশাস্ত্র, যেটি সম্ভবত তৃতীয় খ্রীষ্টাব্দের রচনা -- তাতে নয়টি রসের কথা আসে প্রথম। বিশেষত শৃঙ্গাররস এই নাট্য শাস্ত্রের মূল কথা। মোটামুটি সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত রচনায় নারীর তিন রূপ : গৌরী, বৈদভী আর পাঞ্চালির কথা এসেছে কবিতায়, বারবার। শৃঙ্গাররস এবং রূপ- নারীর এই দুই শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার হিসেবে কাব্যে এবং শ্লোকে প্রকাশ পেয়েছে। নারীর সৌন্দর্য বর্ণনায় তার বাহ্যিক রূপ এবং পোষাক - অলঙ্কারের বর্ণনা পাই আমরা - এই সময়ের সব লেখায়। সংস্কৃত সাহিত্যের নারীরা .. শকুন্তলা-পার্বতী-লক্ষ্মী কিংবা উর্ব্বশী-মেনকা-রম্ভা সবাই ফুলের গয়না পরতেন।

দশম শতাব্দীর চর্যাপদ এবং চর্তুদশ শতাব্দীর শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে বাংলা কবিতার ইতিহাসে প্রথম কবিতা বলে ধরা হয়। এর পর বাংলার মঙ্গলকাব্য এবং বৈষ্ণবগীতির পদগুলি বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম কবিতা বলে দাবি করতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে চারণকবি মুকুন্দদাস এবং রাজকবি ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের হাত ধরে বাংলা কবিতার দিকবদল শুরু। তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, দীনেশ চন্দ্র সেন --- এমন সব মানুষের কলমে বাংলা কবিতার এবং সাহিত্যের বিবর্তন শুরু।

এই সময় থেকেই আস্তে আস্তে বাংলা কবিতায় নারীর অলঙ্কার বর্ণনার চেয়েও কবিতার ধ্বনি ও শব্দ অলঙ্কারের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। জীবনানন্দের ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নেশা’ হঠাৎ করে নারীর সৌন্দর্যবর্ণনার বিষয়টি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়,--- সেই কল্পনার নারীটি কি অলঙ্কার পরেছিল, কাঁচুলি পরেছিল নাকি শাড়ি, -- তা নেহাৎই নগণ্য হয়ে আসে।

জয়দেবের গীতগোবিন্দ কিংবা পরবর্তী কালের বৈষ্ণব পদাবলীতে বাঙালি হিন্দু রমণীর ঘরসংসারের ছবি ফুটে উঠেছে বারবার।

‘বুক ভরা মধু বঙ্গের বধু জল লয়ে যায় ঘরে,
মা বলিতে প্রাণ করে আনচান চোখে আসে জল ভরে’

‘রূপসী বাংলা’র’ এই বঙ্গ রমণীর চিরন্তন রূপটি সেই সময়ের বাংলা সাহিত্যের নারীর প্রচলিত রূপ।

মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনায় নারী শ্রমিক, বা খেতমজুর, কিংবা জেলেরমণী : তাঁরা জীবনসংগ্রামে ব্যস্ত বলেই বোধহয় বাহ্যিক অলঙ্করণে বিশেষ মনোযোগ নেই, অন্তরের বলিষ্ঠ সৌন্দর্য তাঁদের শ্রেষ্ঠ আভূষণ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় গ্রাম্যজীবনের সহজতা : সেই সাপের খেলা দেখানো মেয়েটি কিংবা মাটির বাসন তৈরী করে সংসার চালায় যে মেয়েটি, কৃষকরমনী : তাঁদের আভূষণ নিয়ে তেমন উৎকন্টা দেখতে পাই না আমরা। অনেক পরে.. প্রায় একই ধারায় মহাশ্বেতা দেবী যখন সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের এই নারীর কান্না-যন্ত্রণা-শোষণের ছবি আঁকেন লেখায়, একান্ত ব্যক্তিগত সেই সব লড়াইয়ে জয়ী হয় যে মেয়েরা, তাদের আভূষণ নিয়েও লেখক বা পাঠক মাথা ঘামান না।

বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকাদের বর্ণনায় নারীর পোষাক ও আভূষণ বিশেষ স্থান পেয়েছে। উচ্চকুলের নারীমাত্রেই অলঙ্কার পরিহিতা এবং মহার্ঘ পোষাকে সজ্জিতা হতেন। ‘দূর্গেশনন্দিনী’তে কুমার জয়সিংহের সঙ্গে তিলোত্তমা ও বিমলার প্রথম সাক্ষাৎকার মনে পড়ে? ‘হীরকমন্ডিত চূড় এবং বিচিত্র কারুকার্যখচিত পরিচ্ছদ, তদুপরি রত্নাভরণপরিপাট্য দেখিয়া পান্থ নিঃসন্দেহ জানিতে পারিলেন, এই নবীনা হীনবংশসম্ভুতা নহে। দ্বিতীয় রমণীর পরিচ্ছদের অপেক্ষাকৃত হীনার্ঘতায় পথিক বিবেচনা করিলেন যে, ইনি নবীনার সহচরিণী দাসী হইবেন...’ বঙ্কিমচন্দ্রের সব গল্পে উপন্যাসে এই জিনিসটা আমরা পেয়েছি। উচ্চকুলের মহিলামাত্রেই নানা আভূষণে সজ্জিতা রূপটি বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃণালিনী, কুন্দনন্দিনী, শৈবলিনী প্রত্যেকেই তাই। অলঙ্কার এবং অনিন্দ্যসুন্দর রূপ বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকাদের বৈশিষ্ট্য। উচ্চকুলের মহিলা অথচ অবস্থা বিপাকে হীন অবস্থায় থাকতে বাধ্য হলেও তাঁদের রূপ ব্যক্তিত্ব তাঁদের আলাদা করে রাখে। উদাহরণ হিসেবে কপালকুন্ডলার কথা মনে পড়ছে।

এইখানে বলা হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বাংলা সাহিত্যের বৈষ্ণবী নারী মাত্রেই একটি প্রচলিত রূপ সাহিত্যের সৃষ্ট। নাকে রসকলি, মাথায় টেড়ি কাটা, পরনে কালাপেড়ে সিমলার ধুতি, হাতে একটি খঞ্জনী, -- বৈষ্ণবী যেই হোক, সে হবে সতীত্যবিদ্যয় সুশিক্ষিতা ও পারদর্শিনী। হাতে থাকবে পিতলের বালা, জলতরঙ্গ চুড়ি।

বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শরৎচন্দ্র এবং রবীন্দ্রসাহিত্যেও এই ধারাটি লক্ষ্য করা যায়।

এঁরা অপেক্ষাকৃত নিম্নবর্গের মানুষ, হয়ত বা অপবিত্র জাতি। এইখানে একটা কথা মনে হয়, এই সময়ের সাহিত্যে নারীর আভূষণ ও রূপবর্ণনায় মূল উদ্দেশ্য ছিল নারীর ব্যক্তিত্ব বা চরিত্র ফুটিয়ে তোলা।

‘ইন্দিরা’-য় বনেদী মানুষের পরিবারের ছবিটি মনে করি। ‘পালকিখানার ভিতরে কিংখাপ মোড়া, উপরে রূপার বিট, বাঁটে হীরের মুখ...দাসী যে আসিয়াছিল সে গরদ পরিয়া আসিয়াছিল, গলায় বড় মোটা সোনার দানা...’ ইন্দিরার বাবা হরিমোহন দত্ত বুঝলেন, বড়মানুষ বটে।’ বনেদী বড়মানুষের বাড়ির মেয়েরা রত্নখচিত অলঙ্কার ও বহুমূল্য বস্ত্রে সজ্জিতা...তাঁরা সাধারণত স্নিগ্ধজ্যোতির্ময়রূপেণী। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র বা গ্রাম্য নারীর বর্ণনা প্রায়ই এইরকম: রং শ্যম্বর্ণ, বেশভূষায় পরিপাট্য নেই, কানে গোটাকতক মাকড়ি, হাতে বালা, গলায় চিক, কালাপেড়ে কাপড় পরা। চরিত্র ভালো নয় এমন মেয়েরা শ্যামাঙ্গিনী, এবং তাঁরা বেনারসী শাড়ি ও গিলটির গহনা পরেন এমন একটি রূপ বঙ্কিমচন্দ্রের লেখায় পেয়েছি। ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’র রোহিণী, ‘বিষবৃক্ষে’র হীরা সাজে পোষাকে প্রায় একইরকম। আবার ‘আনন্দমঠে’র শান্তি ছেলেদের মত কোঁচা করে কাপড় পরে, খোঁপা বাঁধে না, ছেলেদের মত ফোঁটা কাটে, চন্দন মাখে। অর্থাৎ, বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে এই কাজগুলি মেয়েলি কাজ হিসেবে বিবেচ্য হত না।

রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, ‘আমাদের মেয়েদের পাড়ওয়ালা শাড়ি, তাদের নীলাম্বরী, তাদের বেনারসী চেলি-- মোটের ওপর দীর্ঘকাল বদল হয় নি-- কেননা ওরা আমাদের অন্তরের অনুরাগকে আঁকড়ে আছে।’ রবীন্দ্রনাথ মনে করেছেন ‘হৃদয়হীন অগভীর বিলাসের আয়োজন অকারণে অনায়াসে ঘন ঘন ফ্যাশানের বদল’ হয়।

রবীন্দ্রনাথের নায়িকারা তাই ঘন ঘন বেশদবল করেন নি, বরং নারীর চরিত্রের অন্তর্নিহিত সত্য, আনন্দময় আত্মার প্রকাশে বারবার উত্তীর্ণ হয়েছেন। ‘রাজা’ নাটকের সুদর্শনা রূপের মোহে মুগ্ধ হয়ে ভুল রাজার গলায় মালা দিলেন, তারপর ভুলের মধ্যে দিয়ে পাপের মধ্যে দিয়ে অন্তরে বাহিরে প্রলয়ের মত অশান্তি বাধিয়ে তুলে শেষ পর্যন্ত সত্যের সঙ্গে মিলনে পৌঁছলেন।

সেই সময়ে বাংলা ভাষাটাকে শিক্ষিত সমাজ অন্দরমহলে ঠেলে রেখেছিলেন। সদরে ব্যবহার হত ইংরেজি-- চিঠিপত্রে, লেখাপড়ায়, এমনকি মুখের কথায়। রবীন্দ্রনাথের পরিবারে কিন্তু তা ছিল না। ব্রাহ্মসমাজের মুক্ত আবহাওয়ায়, মেয়েদের লেখাপড়া করানোর আবহে, উপনিষদের শিক্ষায় শিক্ষিত এই পরিবারের মেয়েরা ‘ঠাকুরবাড়ির ভাষা’য় কথা বলতেন। সেই ভাষাটা সমসাময়িক কথ্য ভাষার তুলনায় মার্জিত, সুন্দর শব্দপ্রয়োগে মনোহর।

এই মেয়েদের সাজপোষাক এবং ব্যক্তিত্বের ছায়া রবীন্দ্রনাথের লেখায় পাই বারবার।

রবীন্দ্রনাথের নারীরা অনেক সাহসী, অসাধারণ তাঁদের অন্তরের সৌন্দর্যে। এই মুহুর্তে যোগাযোগের কুমুর কথা মনে পড়ছে। যোগাযোগের কুমু: তার সেই খদ্দরের মোটা চাদর।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’ বা ‘বীরাঙ্গনা’র তারা, কৈকেয়ী, জনা বাংলা সাহিত্যে নারীর নতুন রূপ। নতুন এক নারী---আত্মমর্যাদাসম্পন্না, নিজের বক্তব্য নিয়ে দৃঢ়, আগেকার মেয়েদের মত শোষিতা-নিপীড়িতা-অবহেলিতা-বোরুদ্যমানা বা মূক ভীতা কোনমতেই নন।

যখন মেয়েরা লিখতে শুরু করলেন, তখন বাংলা সাহিত্যে মেয়েদের আভূষণ বর্ণনা আরও কমে গেল। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে আখতার মহল সায়দা খাতুন, রোকেয়া শাখাওয়াত হুসেন বা সুফিয়া কামাল মুসলমান সমাজের ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে লিখে ফেলছেন ‘জানানা মহফিল’এর মত বই। সেই সুদুর ১৮৮৫ সালে কৃষ্ণভামিনী দাস লিখেছেন ‘ইংল্যান্ডে বঙ্গমহিলা’ - নারীত্বের অহঙ্কারী দীপ্ত শিখা এক একজন। অলঙ্কার নয়, ব্যক্তিত্বই তাঁদের আভূষণ। ব্যক্তিজীবনে এবং রচনায় -- দু জায়গাতেই।

স্বর্ণকুমারী দেবী (১৮৫৫-১৯৩২), প্রসন্নময়ী দেবী (১৮৫৫-১৯৩৯) এবং তাঁর সুযোগ্যা কন্যা প্রিয়ম্বদা (১৮৭১-১৯৩৫), নিস্তারিণী দেবী বা বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২)--- এমন সব মেয়ে-লেখকটরা নারীকে তুলে ধরলেন অন্য এক রূপে। অনিন্দ্যসুন্দর অন্তরের সৌন্দর্যে সুন্দর সব নারী।

শরৎচন্দ্রের সমস্ত উপন্যাস ও ছোটগল্পগুলোকে প্রধানত তিনশ্রেণীতে ভাগ করা হয়-- পারিবারিক, সামাজিক ও মনস্তত্বমূলক। তাঁর অধিকাংশ উপন্যাস ও গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাঙালি সমাজ নিয়ে জিজ্ঞাসা ও মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্তর ও বাহির জীবনের ছবি। শরৎ চন্দ্রের লেখায় তেমনভাবে আভূষণ বর্ণনা পাই না আমরা তবে নারীর অন্নপূর্ণা রূপ বা লক্ষ্মীঠাকরুণের মত রূপটি বারবার ফিরে এসেছে। রূপসী সেই নায়িকাদের সবার মাথায় এক ঢাল চুল, গলায় হার, পায়ে মল- তাঁরা মায়া-মমতায় স্নেহে-প্রেমে সেবা-যত্নে সমাজ সংসারে লক্ষ্মীশ্রী ফুটিয়ে তোলেন। শরৎচন্দ্রের লেখায় বাইরের সাজের বিশেষ উল্লেখ হয় কেবল সেই মেয়েদের বেলায়, যাঁদের চরিত্র তেমন উজ্জ্বল নয়। উদাহরণ: আঁধারে আলোর বিজলী, দীনেশ চন্দ্র সেনের ‘বৃহৎবঙ্গ’ বঙ্গসমাজের সুন্দর রূপায়ণ। তাতে একটা ইন্টাররেস্টিং কথা পড়ি। মোটামুটি চর্তুদশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজে মেয়েদের মধ্যে শাঁখের গয়না পরার চল হয়েছিল। এই শঙ্খের অলঙ্কার প্রথম তৈরী হয় ঢাকায়। সেই সময়ের সাহিত্যের নারীরা শাঁখের গয়না পরতেন এমন তথ্য তিনি বিশদে দিয়েছেন।

শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসের নায়িকারা প্রায় সবার বর্ণনায় একটা মিল পাই। একটু উদ্ধৃতি দিই। ‘মুর্তিমতী লক্ষ্মীরূপ, তপ্ত-কাঞ্চনবর্ণা, পরিধানে রত্নদ্যুতিখচিত পট্টাম্বর, কন্ঠে কর্নে কটিতে মণিময় অলঙ্কার মণিবন্ধে শশিকলার ন্যায় শঙ্খবলয়, সীমন্তে সিন্দুর, মাথায় অবগুন্ঠন সীমন্ত পর্যন্ত আসিয়া থামিয়া গিয়াছে।’

সেইসঙ্গে মুখশ্রী বা ভঙ্গিমায় একটা আত্মমর্যাদার ছবি দেখা যায় শরদিন্দুর নায়িকাদের মধ্যে। ‘কুমারসম্ভবের কবি’র রাজকন্যা হৈমশ্রীর সঙ্গে পাঠকের প্রথম পরিচয়মুহুর্তটা মনে করি এখানে। ‘প্রধান পট্টবেদিকার ওপর প্রায় পঁচিশ-ত্রিশটি সুন্দরী সুবেশা তরুণি..পদ্মের উপর প্রজাপতির ন্যায় ইতস্তত সঞ্চরণ করিয়া বেড়াইতেছে...একটি তরুণী মৃণাল বাহু তুলিয়া শুকপক্ষীদের ধানের শীষ খাওয়াইতেছেন। এই তরুণীর দেহের ও গ্রীবার মর্যাদাপূর্ণ ভঙ্গিমা হইতে অনুমান হয় যে ইনিই রাজকন্যা হৈমশ্রী।’ হৈমশ্রী প্রধানা রূপসী, সেইসঙ্গে অভিমান তীক্ষ্ণবুদ্ধি বৈদগ্ধ ও সৌকুমার্য মিশিযা মুখে অপূর্ব লাবণ্য ঝলমল করে।

শরদিন্দুর লেখায় আমরা বারবার দেখা পেয়েছি এমন নারীর। বাইরের রূপ কেবলমাত্র উল্লেখ্য নয়, বৈদগ্ধ জ্ঞান এবং একইসঙ্গে সৌকুমার্য ও আত্মমর্যাদার পরিপূর্ণা নারীর রূপ। শরদিন্দুর নায়িকারা খুব ফূলের গয়নাও পরতেন। সে ঐতিহাসিক নায়িকাই হন, কি আধুনিকাই হন।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রথমেই যাঁর কথা বলতে হয়, তিনি বুদ্ধদেব বসু। বুদ্ধদেবের নায়িকারা আত্মমর্যাদাসম্পন্না সম্পুর্ণা নারী -- সে গৃহস্থ বধু নীলিমাই হোক, কি কলেজে পড়া অপর্ণাই হোক। বুদ্ধদেবের লেখায় নারী উপস্থিত হয় তার সমস্ত পারিপার্শ্বিককে নিয়ে। ‘শিশির, ঘাস, কাঁচা নরম গোলাপ রোদে, টাটকা সবুজ নরম গন্ধ বাতাসে -- তন্বী, শুভ্রা --টুকটুকে লাল গায়ের জামা, ধবল শাড়িতে লাল পাড় জড়িয়ে... আলোর মত।’

কখনও বা নারীর আগমনেই রঙিন আভা সমস্ত পারিপার্শ্বিকে... ‘চোখ নামাতেই মনে হল কাগজে যেন সবুজ একটা আভা পড়েছে, আর তার কলমের চিক্কণ কালো শরীরে একটি রেখার ঝিলমিলি। ফিরে তাকিয়ে দেখল- তন্দ্রা। লম্বা, লাল পাড়ের কচিপাতা রং-এর শাড়ি, দাঁড়িয়ে আছে তার স্তব্ধ ঘরটিতে রঙের ঘন্টা বাজিয়ে।’
কিংবা ‘পাতলা ছিপছিপে মেয়ে, শ্যামল রঙ, ফিকে নীল শাড়ি পরে কলেজে আসে। সরু হাতে একটি মাত্র চুড়ি, মাথার কাপড়ের চওড়া পাড় মুখখানাকে ঘিরে আছে।’

ও পার বাংলার কবিদের মধ্যে প্রথমেই নজরুল। বাংলার বধূর চিরন্তন রূপটি বার বার ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। অন্যদের লেখায় নারী প্রবলভাবে বিদ্যমান অনেক সময়ই, তবু তেমনভাবে নারীর সাজপোষাকের বর্ণনা পাই না। কবি শামসুর রহমান, জসীমুদ্দিন, মীর মোশারফ হোসেন, বা সেলিনা হোসেন কিংবা হুমায়ুন অহমেদের মত গদ্যকার--- কারো লেখাতেই নয়।

পরবর্তীকালের গদ্যে শীর্ষেন্দুড়-সুনীল-সমরেশ বসু-সমরেশ মজুমদার বা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-প্রফুল্ল রায় কিংবা হালের হর্ষ দত্ত-- কিংবা কবিতায় সুনীল-শক্তি-নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী...আজকের জয় গোস্বামী-শ্রীজাত-মল্লিকা-মন্দাক্রান্তা...এঁদের লেখায় নারীর আভূষণ বর্ণনা প্রায় নেই বললেই চলে। নারীকে আপন স্ব-মহিমায় প্রকাশ হতে দেখে মেয়েরা তৃপ্তির শ্বাস ফেলেছেন অবশ্যই।

মেয়েদের লেখায় অবশ্য প্রায়ই শাড়ি, শাড়ির রঙ পেয়েছি আমরা। প্রতিভা বসুর অনেক নায়িকাই নীল শাড়িতে স্বচ্ছন্দ। বাণী বসুর গল্পে ‘সাদা বেনারসি, মুক্তোর হার আর কানের দুল আর মাথায় লম্বা বেণীতে একটা বড় সাদা চন্দ্রমল্লিকা’ মুহুর্তেই কেমন স্নিগ্ধ করে তোলে মন। বাণী বসুর গল্পে নানা শাড়ির কথা এসেছে-- পোষাকের কথা এসেছে--পড়তে পড়তেই মারাঠী বা সদ্য-তরুণী ইমন আলাদা হয়ে ধরা পড়ে পাঠকের চেতনায়।

এই আবছায়ায় নারীর সাজ বর্ণনা অবচেতনেই ছুঁয়ে ফেলে পাঠককে। নারীর ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র সুচিত্রা ভট্টচার্য-নবনীতা দেবসেন বা হালের তিলোত্তমার নায়িকাদের আভূষণ বর্ণনা প্রায় নেই বললেই চলে। এঁদের নায়ক-নায়িকাদের চরিত্রের একটা বিশেষ ভাব, একটা বলিষ্ঠ বা নেহাৎই সাদামাটা ভাবটিই পরিচয়বহন করে।

তবে সবার ওপরে বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশী’ কবিতার সেই ‘পরণে ঢাকাই শাড়ি সিঁথিতে সিঁদুর’ বাঙালী নারীর অপরূপ একটা ছবি তৈরী করে, বাঙালির মনে নারীর এক চিরন্তন ছবি এঁকে রেখেছে।

Comments

busy

আইভি চ্যাটার্জী
About the author:
জন্মকর্ম সবই জামশেদপুরে। সৃষ্টিশীল কাজ করতে ও নানা ধরনের বই পড়তে ভালবাসেন। আকাশবাণী জামশেদপুরের বিভিন্ন আলোচনা ও অনুষ্ঠানের নিয়মিত বক্তা। মানুষকে ভালোবাসেন ও তাদের জানার এক অদম্য কৌতুহল নিজেকে খুঁজে পেতে সাহায্যকরে বলে ঊনি মনে করেন।