নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ১১

এর আগে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ : সূচনায়
নেতাজীর হোমফ্রন্ট
[ সর্ব ভারতীয় ফরোয়ার্ড ব্লক- বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (বি-ভি)]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট। সুভাষচন্দ্র গান্ধীজী ও তাঁর অনুগামী কংগ্রেসকে নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের এই সংকট মুহূর্তে ইংরেজের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের অবতারণায় ব্যর্থ। গান্ধীজী ও তাঁর অনুগামীরা অদূরদর্শিতার শিকার; তাঁরা সুভাষচন্দ্রের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিলব্ধ জ্ঞানের উপলব্ধি করতে হয় অসমর্থ নয়ত বা ইংরেজের মরণ কামড়ের ভয়ে ভীত-শঙ্কিত।

    সুভাষচন্দ্র গান্ধীজী ও তাঁর অনুগামী নেতৃবৃন্দকে সংগ্রামমুখি করার শেষ প্রচেষ্টায় হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনের সূচনা করেন। এই আন্দোলন শুরু হওয়ার আগের দিন ১৯৪০ সনের ২রা জুলাই সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে বন্দী করা হয়। সুচতুর ইংরেজ আন্দোলনের হাওয়া বেশীদূর এগুতে দিল না। তারা হলওয়েল মনুমেন্টটিই অপসারণ করে অবস্থার সামাল দিলেও সুভাষচন্দ্রকে মুক্তি দিল না। এই আন্দোলন, ইংরেজ মানসে তার প্রতিফলন ও প্রতিক্রিয়া, গান্ধীজী ও তাঁর অনুগামীদের মানসিকতায় কোন রেখাপাত করতে পারল না।

    মহাযুদ্ধের সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ বিশেষ তৎপরতার সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের হোমফ্রন্ট বেঙ্গল-ভালান্টিয়ার্সের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালের ১২ই এপ্রিল পুলিশ দলের পঁচিশ জন নেতা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে সদ্যপ্রবর্তিত ভারতরক্ষা আইনে বিনা বিচারে বন্দী করে। এ পর্যায়ে এঁরাই ভারতের প্রথম নিরাপত্তা বন্দী। এঁদের মধ্যে হেমচন্দ্র ঘোষ ও সত্যরঞ্জন বক্সীও ছিলেন ; ছিলেন মেজর সত্যগুপ্ত, মনীন্দ্র কিশোর রায়, রসময় শূর, ভূপেন্দ্র কিশোর রক্ষিত রায়, ভবেশ নন্দী, সুপতি রায়, নিরঞ্জীব রায়, জ্যোতিষ জোয়ারদার, নিকুঞ্জ সেন, মনোরঞ্জন সেন, বীরেন ঘোষ, কালিপদ ব্যানার্জী, মধু ভট্টাচার্য, চিত্ত বিশ্বাস, পরিমল রায়, হরিপদ ভৌমিক, প্রফুল্ল ত্রিপাঠি, ভূপতি মন্ডল, ক্ষিতি সেন, ফণী দাস, অমল নন্দী, বিমল নন্দী প্রমুখ। বি-ভির প্রতিষ্ঠাতা নেতা হেমচন্দ্র ঘোষ ও নেতা সত্যরঞ্জন বক্সী ও মনীন্দ্র কিশোর রায়কে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়েছিল। জুলাই মাসে সুভাষচন্দ্রকে গ্রেপ্তার করলে তাঁরও স্থান হয় প্রেসিডেন্সি জেলেই সেকথা পূর্বেই বলা হয়েছে। এর ফলশ্রুতি সুভাষচন্দ্র-হেমচন্দ্র-সত্যরঞ্জন-মনীন্দ্র কিশোরের সঙ্গে বিশেষভাবে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগ পেলেন। এ আলোচনায় সুভাষচন্দ্রের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সুনির্দিষ্টরূপে নির্ধারিত হলো। সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গেই নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌছাবার জন্য তাঁর পদক্ষেপ শুরু।

    প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে যে সুভাষচন্দ্র এর বহু পূর্বেই আগত মুক্তিসংগ্রামকে যথোচিতভাবে রূপ দিতে যথাসময়ে বর্হিভারতে পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। এ সম্বন্ধে ফরোয়ার্ড ব্লকের তৎকালীন সভাপতি সর্দার শার্দুল সিং কবীশর ১৯৬২ সালে ‘হিন্দুস্থান ষ্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকার পূজা স্পেশাল সংখ্যায় “Netaji and India’s Fight for Freedom”নামক একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। মূল ইংরাজী নিবন্ধটি ক্রোড়পত্র ‘ঘ’ তে দেওয়া হলো। ঐ প্রবন্ধে পত্রিকার ৩৪০ পৃষ্ঠায় এ সম্বন্ধে তিনি ‘লিখেছেনঃ ‘সুভাষচন্দ্রের সরাসরি খবর ছিল হিটলার ও মুসোলিনি ইউরোপ মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স, ইংল্যান্ড এবং তাঁদের সমর্থকরা জার্মানি-ইতালির উপর যে যন্ত্রনাদায়ক চুক্তিপত্র চাপিয়ে দিয়েছিল, ফলে, তাঁরা এত বিক্ষুব্ধ ছিলেন যে তাঁরা ইউরোপ ও আফ্রিকার মানচিত্রের আমূল পরিবর্তন করে দিতে চেয়েছিলেন। ইতালীর মুসোলিনি ও জার্মানীর হিটলার সুভাষচন্দ্রকে ভারতের জাতীয়তাবাদীদের এ তথ্য জানাতে বলেছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের তৎকালীন এ সুযোগের যথার্থ ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সুভাষ চন্দ্রও যথাযথ মুহূর্তে জাতীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পরাধীনতার জোয়াল ছুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। গান্ধীজী যদিও সুভাষের মতই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য উদগ্রীব ছিলেন তবুও তিনি তাঁর অহিংসবাদের সঙ্গে একীভূত থাকায় সুভাষচন্দ্রের পথের সঙ্গে একমত হতে পারলেন না।”

    সুভাষচন্দ্র যেমন যুদ্ধোদ্ভুত বিশেষ পরিস্থিতিতে গান্ধীজীর নেতৃত্বে মুক্তিসংগ্রামের অবতারণায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তেমনি বিকল্প প্রচেষ্টা থেকেও তিনি বিরত ছিলেন না। কংগ্রেসের মধ্যেই ‘ফরোয়ার্ড ব্লক’ গঠন করলেন কংগ্রেসকে সংগ্রামমুখী করার অভিপ্রায়ে।

    সুভাষচন্দ্র যুদ্ধোদ্ভুত পরিস্থিতিকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছবার জন্য তিনি তাঁর সহকর্মীদের মাধ্যমে সারা বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতেন। এ সম্বন্ধে সর্দার শার্দুল সিং কবিশর তাঁর নিবন্ধে লিখেছেনঃ “১৯৩৯ সালে ইউরোপে যুদ্ধ বাঁধে। সুভাষচন্দ্র ইউরোপে তাঁর গুপ্ত প্রতিনিধি(Emissaries) পাঠান। তথাপি তিনি তাঁর অত্যন্ত বিশ্বস্ত প্রতিনিধি দিল্লীর লালা শঙ্কর লালকে তৎকালীন নিরপেক্ষ জাপানে প্রেরণ করেন; জাপান সে সময় মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নাই। তাঁর বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল জাপানে অবস্থিত অক্ষশক্তির দূতাবাসগুলির মাধ্যমে সুভাষ বসুর কর্মধারা অক্ষশক্তিকে বুঝিয়ে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা তথা সহায়তা লাভ করা। এখানে এক বিশেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাচ্ছেঃ তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তরে গোলাম মহম্মদের নামে শঙ্কর লালের পাসপোর্ট বের করা হয়েছিল। এই গোলাম মহম্মদই পরবর্তীকালে পাকিস্থানের গবর্ণর-জেনারেল হন।”

    কোন রকম চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে সুভাষচন্দ্র বৃটিশ সরকারের সঙ্গে একটা শেষ সমঝোতা করে নিতে চাইলেন। সুভাষচন্দ্রের এ সময়ের কর্মধারা সম্বন্ধে সর্দারজী তাঁর নিবন্ধে লিখেছেনঃ “সুভাষচন্দ্র কোন অপরিবর্তনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্বে, সম্ভব হলে বৃটিশ সরকারের সঙ্গে একবার শেষ বোঝাপড়া করতে চেয়েছিলেন। বৃটিশ যদি ভারতকে স্বাধীনতা দিয়ে কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়ার ধাঁচে ভারতীয়দের হাতে ভারতের শাসন ব্যবস্থাসহ ক্ষমতা হস্তান্তর করে তাহলেই তিনি বৃটিশকে লোক এবং অস্ত্র দিয়ে পূর্ণ সহায়তা প্রদানে প্রস্তুত এটা স্মরণীয় যে সে সময় গান্ধীজী নৈরাশ্যবাদীর মত অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে লোক ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মিত্রশক্তিকে কংগ্রেসের সহায়তার অঙ্গীকারে অনিচ্ছুক ছিলেন; যদিও এর অল্পদিন পরেই নেহেরু ও আজাদের নেতৃত্বে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি গান্ধীজী ও তাঁর গোঁড়া অনুগামী রাজেন্দ্রবাবু, যমুনালাল বাজাজ এবং সর্দার প্যাটেলের মতবাদকে অগ্রাহ্য করে। সুভাষচন্দ্র কারারুদ্ধ হলে সর্দার শার্দুল সিং কবীশর ফরোয়ার্ড ব্লকের সভাপতি হন। তিনি পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খাঁন, বাংলার প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক, পাঞ্জাবের গবর্ণর, রাজন্য সভার নয়ানগরের জামসাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাব যথাযথ অধিকরীদের নিকট পৌঁছে দিতে বলেন। তাঁরা বড়লাট লিনলিথগো এবং তাঁর উপদেষ্টাদের প্রস্তাবটা জানান, কিন্তু তাঁদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না। সুভাষবাবু যতটা চাইছিলেন বৃটিশ সরকার ততটা এগোতে প্রস্তুত ছিল না। বৃটিশ সরকার এও মনে করত যে কংগ্রেসের কাছ থেকে কোন প্রস্তাব থাকলে সে প্রস্তাব সুভাষচন্দ্রের প্রস্তাবের থেকে অনেক সহজ ও নিজ স্বার্থের পক্ষে বেশী সহায়ক হবে; আর কংগ্রেসের তুলনায় ফরোয়ার্ড ব্লকের কার্যকরী ক্ষমতা সম্বন্ধেও বৃটিশ সরকার যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিল। বড়লাটের ইনটেলিজেন্স ডায়রেক্টর স্যার জেনকিনস কবীশরের সঙ্গে সাক্ষাতে শেষ পর্যন্ত সচেষ্ট হন; সুভাষচন্দ্র কিন্তু ইতিমধ্যে অক্ষশক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে ইউরোপে যাওয়ার জন্য মনস্থির করে ফেলেছেন এবং লালা শঙ্করলাল জাপানে গিয়ে অক্ষশক্তির দূতাবাসের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলেন। কবীশরকে এ ব্যাপারে (স্যার জেনকিনস এর সঙ্গে আলোচনায়) আর অগ্রসর হতে নিষেধ করা হলো। কবীশর স্যার জেনকিনস এর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। ফরোয়ার্ড ব্লক কর্মীদের প্রোগ্রামের পরের কর্মসূচী ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।”

    সুভাষচন্দ্র-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে বর্হিভারত থেকে মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করার কথা যেমন ভাবছিলেন তেমনি এবং এই উভয় শক্তির আওতার বাইরে থেকে মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করার প্রচেষ্টার কথাও অনেক পূর্ব থেকেই ভাবছিলেন এবং সে প্রচেষ্টা যে করেছিলেন তার প্রমাণও পাওয়া যায়। শিশির বসু তার ‘বসুবাড়ী’ পুস্তকের ৯২ পৃষ্ঠায় লিখেছেনঃ “১৯৩৯ সালের একটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার কথা আমি অনেক পরে, ১৯৬৬ সালে জানতে পারি। শুনতে পেলাম এক চীনা ভদ্রলোক, যিনি ১৯৩৯ সালে কলকাতায় চীন সরকারের কূটনৈতিক প্রতিনিধি ছিলেন, কলকাতায় এসেছেন। নাম হুয়ান চাও চিন। নামটা যেন দলিলচিত্রে কোথাও দেখেছি বলে মনে হল। টেলিফোনে যোগাযোগ করে চৌরঙ্গির হোটেল থেকে তাঁকে নেতাজী ভবনে ধরে নিয়ে এলাম। নেতাজী ভবনে এসে তিনি খুব খুশি; বললেন, এই ঘরেই তো ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়েছিল। রাঙাকাকাবাবু তাঁকে গোপনে ডেকে জানতে চেয়েছিলেন, চীন সরকার তাঁকে আশ্রয় দিতে রাজি হবে কিনা। দেশে থেকে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রাম চালাতে পারবেন না, কারণ ইংরেজ সরকার যে কোন অজুহাতে যতদিন যুদ্ধ চলবে ততদিন তাঁকে বন্দী করে রাখবে। চীনা ভদ্রলোকটি খোঁজ-খবর করে রাঙাকাকাবাবুকে জানান যে, সৌজন্যমূলক যাত্রায় কোন বাধা নেই, তিনি চীনে স্বাগত, কিন্তু রাজনৈতিক কার্যকলাপের সুযোগ চীন সরকার তাঁকে দিতে পারবেন না, কারণ ইংরেজ সরকারের সঙ্গে তাঁদের বন্ধুত্বের চুক্তি রয়েছে।

    ...বৃটিশ সরকারও রাঙাকাকাবাবুকে সেই সময় চীন যাবার জন্য পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করেছিল।” প্রসঙ্গত- এ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে কোন দেশের বিদেশনীতিই আদর্শভিত্তক নয, সম্পূর্ণভাবেই জাতীয় স্বার্থভিত্তিক।

    সুভাষচন্দ্র কলকাতার পাঞ্জাবী নেতা নিরঞ্জন সিং তালিবের মাধ্যমে ‘কীর্তি কিষাণ’ দলের সহায়তায় ভারত-সীমান্ত অতিক্রম করে রুশ দেশে যেতে চেয়েছিলেন এবং সে প্রচেষ্টা পরিত্যক্ত হওয়ার কারণ পুণরুক্তি হলেও সর্দার শার্দুল সিং কবিশরের নিবন্ধ থেকে বিবৃত হলো। সর্দারজী তাঁর পত্রিকার নিবন্ধের ১৪২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “সুভাষ বোস প্রথমে ১৯৪০ সালের শুরুতে রাশিয়া যাওয়ার ব্যবস্তা করেছিলেন। পাঞ্জাবের কম্যুনিষ্ট বন্ধুর সহায়তায় এ ব্যবস্থা হয়েছিল। কিন্তু বন্ধুটি কলকাতায় তাঁর এক পাঞ্জাবী কোটিপতি  বন্ধুর কাছে কথাটা ব্যক্ত করে। এই কমুনিষ্ট বন্ধুটি ছিলেন পলাতক এবং এই কোটিপতির আর্থিক সহায়তাই তিনি কলকাতায় গোপনে অবস্থান করতেন। এই কোটিপতি বন্ধুটি সরকারের ইঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের এক অফিসার বন্ধুর কাছে কথাটা প্রকাশ করে ফেলেন-অবশ্য কোন মতলব নিয়ে নয়। খবরটা ক্রমে অবাঞ্ছিত জায়গায় চলে যেতে পারে এ আশঙ্কায় সাময়িকভাবে পরিকল্পনাটি পরিত্যক্ত হয়। বছর খানেক বাদে এ প্রস্তাবটি আবার গ্রহণ করা হয়।”

    গান্ধীজী ও তাঁর অনুগত কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ সংগ্রামমুখী করতে সুভাষচন্দ্র শেষ পর্যন্ত অসমর্থ হলেন। কংগ্রেসের তথাকথিত প্রগতিবাদী তথা সমাজবাদী নেতৃবৃন্দের এক বৃহৎ অংশ ফ্যাসিবাদী শক্তিকে রুখবার জন্য বিনা শর্তে ইংরেজকে যুদ্ধে সাহায্য করতে উন্মুখ। গান্ধীজী ও তাঁর অনুগামী কংগ্রেসকে জনগণের সংগ্রাম মানসিকতার সামিল করার মানসে সুভাষচন্দ্র ইসু-ভিত্তিক সংগামের ডাক দেন। তিনি ৩রা জুলাই, ১৯৪০ এ হলওয়ের মনুমেন্ট অপসারণের জন্য সত্যাগ্রহ আন্দোলনের ডাক দিলে ২রা জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রেসিডেন্সি জেলে স্থানান্তরিত করে।

    সুভাষচন্দ্র বিভির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মিলিত হলে আগত আন্দোলনের ধারা ও ভবিষ্যত পদক্ষেপ সম্বন্ধে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। স্থির হয় যে সুভাষচন্দ্র বর্হিভারত থেকে মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করবেন। তাঁরা এও স্থির করেন যে সুভাষচন্দ্র আমরণ অনশন শুরু করে তাঁর নিজ মুক্তি আদায় করবেন এবং ভারত থেকে পালিয়ে যাবেন।

    বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (বি-ভি) এর সদস্য ও কলিকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি অশোক সেন ‘রাখাল বেনু’ সাময়িক পত্রিকার ১৩৯০র সত্যরঞ্জন বক্সী স্মরণ সংখ্যার ৩১ পৃষ্ঠায় এ সম্বন্ধে লিখেছেনঃ “সুযোগ আসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়। হেমচন্দ্র ও সত্যরঞ্জন সহ বি-ভির প্রায় সমস্ত নামী নেতাই তখন কারাগারে। ভাগ্যক্রমে সুভাষচন্দ্রও তখন কারাগারে। মহাযুদ্ধের সুযোগ কিভাবে গ্রহণ করা যায় তাহা লইয়াই দিনের পর দিন সুভাষচন্দ্রের বিশেষ পরামর্শ চলে হেমচন্দ্র এবং বিশেষ করে সত্যরঞ্জন বক্সীর সঙ্গে। তারপর আমরণ অনশন, অনশনের হুমকিতে ও অসুখের কারণে প্রায় একই সময় সুভাষচন্দ্র ও সত্যরঞ্জন দুজনেরই সাময়িকভাবে কারামুক্তি ঘটে।”

    এই সাময়িকীর এই সংখ্যাতেই বি-ভির অন্যতম সদস্য অমলেন্দু ঘোষ এ বিষয়ে একই কথা লিখেছেন তাঁর ‘দেশবন্ধু, সুভাষচন্দ্র ও সত্যরঞ্জন’ নিবন্ধে। সত্যরঞ্জন বক্সী মহাশয় শেষবার যখন ‘কীর্তি’ ও সি.পি.আই এর বিশ্বাসঘাতকতার বলি হয়ে গ্রেপ্তার বরণ করেন তার কয়েকদিনের মধ্যেই অমলেন্দু বাবুও ঐ বিশ্বাসঘাতকতায় গ্রেপ্তার বরণ করেন। তিনি লিখেছেনঃ “দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ যিনি যাই বলুন না কেন, শেষপর্যন্ত সুভাষচন্দ্রের ভবিষ্যত বাণীই কিন্তু ঠিক হলো। সত্যি ছয়মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আর অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই অকস্মাৎ ১৯৪০ সালের ১২ই এপ্রিল মধ্যরাত্রে হেমচন্দ্র ঘোষ ও সত্যরঞ্জন বক্সী সহ বি-ভির ২৫জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হলো। এর কয়েক মাস পরে হলওয়েল মনুমেন্ট আন্দোলনের ব্যাপারে ১৯৪০ সালের ২রা জুলাই সুভাষচন্দ্র নিজেই গ্রেপ্তার হয়ে গেলেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো প্রেসিডেন্সি জেলে। সহবন্দী হিসাবে সেখানে তিনি পেলেন হেমচন্দ্র ঘোষ, সত্যরঞ্জন বক্সী ও মনীন্দ্র কিশোর রায়কে। এ ভাবে এই মহাযুদ্ধের পটভূমিকায় কি করণীয় সে সম্বন্ধে তাঁদের মধ্যে একান্ত গভীর আলোচনার সুযোগ এসে গেল। তাঁরা তাঁদের কর্তব্য ঠিক করে ফেললেন। যে ভাবেই হোক, অন্তত সুভাষচন্দ্র ও সত্যরঞ্জনকে জেল থেকে বেরুতেই হবে। বাড়িতে অন্তরীণ থাকুন কি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রহরী পরিবৃত অবস্থায় থাকুন তাতে ক্ষতি নেই।

    তারপর সত্যি একদিন অসাধ্য সাধন হলো। ক্রমে ক্রমে সুভাষচন্দ্র ও সত্যরঞ্জন দুজনেই স্ব স্ব গৃহে অন্তরীন হলেন।”

(এর পর আগামী সংখ্যায়)


নেতাজীর হোমফ্রন্ট বাংলা ১৪০৪ সালের আশ্বিন মাসে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। লেখকের অনুমতিক্রমে মুখোমুখি.কম, ইন্টারনেট পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এই পুস্তকটি পুনঃপ্রকাশ করা হচ্ছে।

Comments

busy

সত্যব্রত মজুমদার
About the author: