নেপথ্যে
লিখেছেন চিরঞ্জয় দাস   

উজ্জৈনীর মন ভালো নেই। কাল রাতের দিকে ভাবনা ফোন করেই তাকে খবরটা তাড়াহুড়োর মধ্যে এক নিশ্বাসে বলে যাওয়ার পরই টিভির সমস্ত খবরের চ্যানেল তোলপাড় করে ফেলেছিলো। একগাদা মেক-আপ মেখে, ইংরেজদের মতো কোটপরিহিতা সুন্দরী মহিলারা ঠোঁটের চুলচেরা সঠিক হিসেব-কষা নড়াচড়ায় জানিয়ে দিচ্ছিল সেই খবরটা। এপরও সে ফোন করে তার বাবাকে, মনের কোণে একটু আশা তখনও খুব সন্তর্পনে প্রজনন পদ্ধতিতে লালিত হচ্ছিলো, যে সব মিথ্যেই হবে-কিন্তু যাদবজীও আলাদা কিছু বললেন না‍!

উত্তর প্রদেশের এই মন্দির শহরে তখন শীতের সময়। কনকনে ঠান্ডায় শহর যেন কুয়াশার চাদরে মৃত নগরী। গঙ্গার ধারের আলোর কণাগুলো প্রচন্ড ঠান্ডায় জমে গিয়ে বেশীদূর ছড়িয়ে পড়তে পারছে না। টুকরো আলো নিকশ কালো শীতের রাতের আধারে যেন আকন্ঠ ডুবে রয়েছে।


মুকুন্দলাল যাদব বারাণসী শহরের ডি.আই.জি। উত্তর প্রদেশের লাগোয়া এক রাজ্যে গতমাসে ঘটা বিস্ফোরণের তদন্ত করতে নেমে দেখা যায় যে ঐ হত্যালীলার অন্তরালে যে দলটি রয়েছে তার কিংপিন নাকি বারাণসীতে বসে চুলচেরা ছক কষে ভারত জুড়ে একের পর এক বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে। মুকুন্দলাল নিজে এই তদন্তটির রাজ্যস্তরে ভার পান গত সপ্তাহে। একরাশ অবিশ্বাস নিয়ে উনি যখন ঐ কিংপিনের হদিস জানতে পারেন তখন তাঁর বত্রিশবছরের পুলিশ জীবনে সবচেয়ে তাজ্জব বনে যান।


গতসপ্তাহে বুধবার পঞ্জাবের দোর্দন্ডপ্রতাপ পুলিস অফিসার মনজিৎ সিং ফোনে যখন যাদবজীর সাথে কথা বলেন তার স্বরে যেন চাপা উত্তেজনা। এরা দুজনেই আই.পি.এস-এর একই ব্যাচের। তাই বন্ধুত্বের দরুণ মাঝে মধ্যেই ফোনে কথা হয় দুজনের। এই হাসিঠাট্টার কথা বা কুশল বিনিময়ের সাথে সাথে কিছু রসালো উক্তিও। কিন্তু সেদিন মনোজিৎ দুকথার পর পরই সরাসরি পঞ্জাবে বিস্ফোরণের কথায় চলে এসেছিলো। পঞ্জাব পুলিশের বিভাগীয় শাখা তদন্ত করে যে আঁচ পেয়েছে দুষ্কৃতিকারী বারাণসীর দেবধামে সাধু সেজে বসে রয়েছেন সেই তথ্য এক নিশ্বাসে জানিয়ে বলেন, যাদবজী, এই কিংপিনকে ধরতে পারলে মনে হয় বেশ কটা বিস্ফোরণের জট খুলে যাবে। - আরে বলো কি সিং সাহেব, মহাশয় আমারই শহরে অতিথি হয়ে আছেন আর আমিই জানি না!
- মুকুন্দজী একে ধরে দেওয়ার দায়িত্ব আপনিই নিন।
- আরে বিলকুল। আমার অতিথিকে আমিই অভ্যর্থনা করব! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন!
- আমি কিছু ফাইল কালই পাঠিয়ে দেব যাতে আইডেন্টিফাই করতে সুবিধা হয়।
- জী বিলকুল।

মুকুন্দলাল ধার্মিক মানুষ। প্রতিদিন গঙ্গাস্নান সেরে তিনি কাশীবিশ্বনাথের পুজো দিয়ে বাড়ি ফেরেন। মন্‌জিৎ সিং-এর টেলিফোনটা পাওয়ার পরদিনও এর কোনো হেরফের হয় নি। তিনি দুঁদে অফিসার। ত্রিশ বছরের কর্মজীবনে তিনি বহু জটিল কেস সমাধান করেছেন। পরদিন বিকেলে মন্‌জিৎ সিং কথামতো দুটি ফাইল পাঠিয়ে দেন। ফাইল গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ে কখন যে রাত বারোটা বেজে গেছে আর কখন যে এক প্যাকেট সিগারেট নিঃশেষ করে ফেলেছেন তার কোনো খেয়াল ছিল না। এই তথাকথিত কিংপিনের সম্পর্কে পড়ে ও তার ছবি দেখতে দেখতে তিনি অবাক হয়ে গেছেন। তাঁর মতো ডাকসাইটে অফিসারের এতো বড় ভুল হলো কি করে- শুধু এই ভেবেছেন আর এরই মধ্যে উজ্জৈনী দু দু’বার ফোন করে মনে করিয়েছে যে একদিনে রাত শেষ হয়ে পরের দিন শুরু হয়ে গেছে!


দুটো ঘুমের বড়ি খেয়েও সেই রাতে ঘুম হয়নি। শুধু মনে হয়েছে তাঁর ত্রিশ বছর ধরে কষ্ট অর্জিত সম্মান, পদ, যেন কেউ লহমায় ধূল লুন্ঠিত করে তাঁকে চূড়ান্ত অপমান করেছে! চিরজীবন ক্ষুরধার বুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়ে সব পরীক্ষায় সুনামের সাথে পাশ করে এই পরীক্ষাটিতে যে তিনি ফেলই করেছেন তাই নয় বরং এই কিংপিন তাঁকে সমাজের চোখে বেশ ভালো রকম বোকা বানিয়ে ছেড়েছে। নিস্তব্ধ শীতের রাতে নিজের নিশ্বাসের আওয়াজ শুনতে শুনতে দপ দপ করতে থাকা কপালের শিরাগুলোতে হাত বুলোতে বুলোতে পরের দিন কিংপিনকে ধরার ছক তিনি করে ফেলেন।


গিরিধারীলালের মা-বাবা দুজনেই বয়স্ক ও রোগগ্রস্ত। মীরা দেবীর তো আথ্রাইটিসের ব্যাথা কোন দিনক্ষণ মেনে শুরু হয় না। আর পরেশনাথ তো সেই সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকেই শয্যাশায়ী। সেদিন সকালবেলা সবে কুয়াশা কেটে গিয়ে রোদটা খোলা দরজার সারিপথে ঢুকে ঘরের কন্‌কনে লাল শালে বিস্তার লাভ করছিলো। বেনারসের এই সরু গলিতেও সূর্যদেবের অকৃপণতা দৃশ্যমান। উল্টোদিকের চৌবেজীর প্যাঁড়ার দোকানের ভিড়, চুরিওয়ালার হাঁক আর পথচলতি মানুষের গুঞ্জনের মধ্যেও কাশীবিশ্বনাথ মন্দিরের ঘন্টাধ্বনী কানে আসে। মীরা দেবী চাল বাছছিলেন আর তুলসীদাসজীর পদ তাঁর ঠোঁটে আপনিই উঠে আসছে। এই সময় মুকুন্দজী ও চারজন পুলিশকে ঘরে আসতে দেখে তিনি বেশ থতমত হয়ে যান। মুকুন্দজী মাঝেমধ্যে ওদেঁর বাড়ি আসেন ঠিকই তবে এই মুকুন্দজী যেন অন্য কেউ। এরপর কয়েকমূহূর্তের মধ্যে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায়। ওয়ারান্ট দেখিয়ে পুত্র গিরিধারীকে বিস্ফোরণে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফ্‌তার করা হয়। এর মধ্যে বাইরে বেশ কিছু লোকও জমেছে। দুই বৃদ্ধার কথায় কেউ কান দেয় নি।


এই চত্তরে শিবলালই সবচেয়ে ভালো পান বানায়। যারা এখান থেকে পান খান তারা বলেন শিবলালের হাতে জাদু আছে। এমন কি অন্যান্য পানের দোকানীরাও শিবলালের এই আধিপত্য মানে। কাল গিরিধারীকে পুলিশ গ্রেফ্‌তার করার পর থেকে এই পাড়াটিতে উত্তেজনা রয়েছে। রাধিকানাথ, দ্বারকাজী, সদানান্দজীর প্যাঁড়ার দোকানে, বলরাজের মুদির দোকান বা কিষণজীর ওষুধের দোকানে আজ রোজকার মতো ভিড় হলেও কেমন একটা থম্‌থমে ভাব রয়েছে কাল থেকে। কাল রাতে প্রচন্ড ঠান্ডায় বৃন্দাবন দাসের আখড়ায় আগুনের তাপ পোহাবার সময় দোকানীদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছিলো। প্রতাপজী, যাদবজীও ছিলেন। দুজনেই শিক্ষক। আর ছিলেন মাসিক পত্রিকা ‘সুবহা’–এর সম্পাদক রামপ্রসাদ যাদব। সকলে মিলেই সিন্ধান্ত নেন যে গিরিধারীলালকে অন্যায় ভাবে হেনস্থা করার প্রতিবাদে তারা পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নীচু করে যে হাঁটে, রাস্তায় দেখা হলেও যে সুন্দর হেসে ‘নমস্তে’ করে, পাড়ার সকলের প্রতি যার এতো সদ্ব্যবহার সে কিনা সন্ত্রাসবাদী! বছর তিনেক হলো এই পাড়ায় এসেছেন মীরাদেবীরা। দিব্যি মিশুকে মানুষ তাঁরা। এক্‌সিডেন্টের আগেও বৃন্দাবন দাসের আখড়ায় জমিয়ে আড্ডা দিতেন পরেশনাথজী। আর গিরিধারী তো বই ছাড়া কিছু বোঝেনই না। সখের মধ্যে বছরে দুতিনবার সে দেশের এদিকসেদিক বেড়িয়ে পড়ে।


আসলে ছমাস পরই পঞ্জাব আর উত্তরপ্রদেশে নির্বাচন। উত্তরপ্রদেশের সরকার সন্ত্রাসদমনে যে কিছুই করতে পারে নি তা মানুষ ভালোভাবেই জানে। একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে গেছে অথচ সেই দুষ্কৃতীরা ধরা পড়ে নি। তাই সরকারের অপদার্থতার মাশুল হিসেবে মানুষের ক্ষোভের আঁচ যাতে ভোটবাক্সের গায়ে না লাগে বা গদি টলিয়ে না দেয় তাই সরকার ও পুলিশবাহিনী হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠেছে দেশকে সম্পূর্ণ সন্ত্রাসমুক্ত করতে। তাই আসন্ন নির্বাচনলগ্নে কাউকে সন্ত্রাসবাদী সাব্যস্ত করে যদি কোন মামলার সমাধান করে ফেলা যায় তবে রাজনৈতিক ফায়দা হবে সরকারের। গিরিধারী এই ষড়যন্ত্রেরই শিকার বলে রামপ্রসাদজী, প্রতাপজী বা যাদবজীদের বিশ্বাস।


ঠিক করা হয়েছে গিরিধারীর প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এঁরা জনমত গঠন করবেন রাজ্যস্তরে। মহাদেবের বাহন শিবলালের দোকানের ধারে রোদ পোহাচ্ছে বসে। শিবলালের হঠাৎ খেয়াল হোলো গত দু সপ্তাহ ধরে যে ভিখারীটা তার দোকানের পাশে বাসা বেঁধেছিলো, গতকালের ঘটনার পর সে বা তার জিনিসপত্রের চিন্হমাত্র নেই আর।


চার দিন হলো কলেজে যায় নি উজ্জৈনী। গিরিধারীলাল গ্রেফ্‌তার হওয়ার পর থেকে সে এতই মুহ্যমান যে বাইরেও যাচ্ছে না বাড়ির। বাবা মুকুন্দলালের সাথেও তার কথা বন্ধ। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকস্তরে প্রথম বর্ষের উজ্জৈনীর, রসায়ণবিদ্যায় গবেষনারত গিরিধারীলালের সাথে পরিচয় প্রায় ছ’মাস হবে। ঝক্‌ঝকে সুন্দর মিষ্টভাষী গিরিধারীলালের ক্লাসের পড়া এক বর্ণও তার মাথায় না ঢুকলেও স্রেফ এই শিক্ষকটির উপস্থিতির জন্য সারাক্ষণ অপেক্ষা করে থাকতো উজ্জৈনী। পড়া বোঝার অছিলায় ক্লাসের বাইরে বা কখনো ক্যাম্পাসে গিরিধালীকে দেখতে পেলেই রসায়ণ তত্ত্বের ব্যাখ্যা চাইতো সে। কোনদিন যেন জ্বরের জন্য আসতে না পারায় সোজা ঠিকানা নিয়ে গিরিধারীর বাড়িতেই উপস্থিত হয় উজ্জৈনী। উজ্জৈনীকে দেখে বেচারা গিরির জ্বর বুঝি বেড়ে যাওয়ার উপক্রম। যাই হোক কিছু কথা, মীরা দেবীর অনুরোধে একটু মিষ্টিমুখ করে উজ্জৈনী সেদিন বাড়ি ফিরে আসে। প্রকৃতির ও সমাজের নিয়মে এর পর ‘আপনি’ পথ ছেড়ে দিয়েছে তুমিকে ওদের মধ্যে।


গিরিধারীলালের বয়স বত্রিশ। উচ্চব্রাহ্মণ। উচ্চশিক্ষিত। সেদিন উজ্জৈনী বাড়িতে আসার পর থেকে মীরা দেবী এই মেয়েটির সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। এক ছেলে গোঁ ধরেছে বিয়ে করে সংসারী হবে না। কত লোক নিজে থেকে সম্বন্ধ করতে চাইছেন। সেদিনই তো মিশ্রজীর কন্যা রাগেস্বরীর জন্য সম্বন্ধ করতে চেয়ে ওদের কুলপুরোহিত বৈষ্ণব দাসজি এসেছিলেন। কুষ্টিবিচার করে তিনি দেখেছেন সাক্ষাৎ রাজযোটক। তবু গিরি আজ নয় কাল নয় করে চলেছে। সেই ছেলে যদি নিজে কাউকে পছন্দ করে তো ভালোই তো। তাছাড়া উজ্জৈনী মেয়েটিকে দেখতেও বেশ। যেন পার্বতী মা! এসব কথাই পড়শী রজনী বেহেনকে বলেছেন মীরা দেবী।


উজ্জৈনী গিরিধারীকে ভালোবাসে। এই দুটি মাস ধরে সে জেনেছে গিরিকে ছেড়ে সে বাঁচবে না। এই বাড়িতে গিরি বার কয়েক এসেছেও। বাবার সাথে খুব জমেও ওর। বাবাও কি পছন্দ করে না? নিশ্চয় করেন। সেদিনই তো একরাশ প্রশংসা করলেন গিরিধারীর। এমনকী গতসপ্তাহে তিনি হঠাৎ এসে বল্‌লেন,
- জৈ তোর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তোর বিয়ে ঠিক করে এলাম।
- মানে। আমি বিয়েই করবো না কখনো। বলেছিল উজ্জৈনী।
- সচ্‌ বাত তো বেটি। বাবার মুখে হাসির আভা।
- সচ্‌ সচ্‌ সচ্‌।
- ঠিক হ্যায়। তো গিরিধারীর মা কে বলতে হবে যে আমার মেয়ে বলছে বিয়ে করবে না।
- ঈশ্‌। আমি কি তাই বলেছি্ লজ্জায় রাঙা হয়ে বেড়িয়ে গেছিলো উজ্জৈনী।
হো হো করে হেসে উঠেছিলেন মুকুন্দলাল।


সেই বাবা কিভাবে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে গ্রেফ্‌তার করে গিরিকে? যে ছেলে একটা ফড়িং কে আঘাত করতে পারে না সে ঘটাবে বিস্ফোরণ!


পঞ্জাবে বিস্ফোরণের পর পুলিশের তল্লাশি অভিযানে বেশ কিছু দুষ্কৃতি ধরা পড়ে। পর পর কিছু রাজ্যে ব্যবহৃত বিস্ফোরণের সরঞ্জাম এবং পদ্ধতির মধ্যে ফুটে ওঠা স্পষ্ট আভাস পুলিশের চোখ এড়ায়নি। পুলিশের জালে আটক দুষ্কৃতীদের ক্রমাগত জিঞ্জাসাবাদ করে যেটুকু জানা যায় এবং চেহারার বিবরণ অনুযায়ী কম্পিউটার কৃত একটা ছবি থেকে বিস্ফোরণের প্রধান নেতার একটা অবয়ব ফুটে উঠলেও তার ঠিকানা বা আশ্রয়ের কোন হদিস মেলেনি। সেই ছবি দেখে চিরুনি তল্লাশি অভিযান শুধু পঞ্জাবেই থেমে না থেকে তা পাশের রাজ্যগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী রাজ্যের আতঙ্ক উত্তর প্রদেশেও সঙ্ক্রমিত হলে এখানে প্রতিটি শহরে পুলিশ প্রহরা বেড়ে যায়, বিশেষ করে মন্দির শহর বেনারসে। হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে প্রহরারত কিছু পুলিশ গিরিধারীলালকে বেশ কদিন লক্ষ্য করে, এমনকি বাড়ি পর্যন্ত। কম্পিউটার বর্ণিত চিত্রের সাথে বেশ কিছু তারতম্য থাকলেও আদলটা যে অনেকটাই এক। এই ছবির ওপর আরো কিছু কাটাকুটির পর যেন গিরিধারীলালের মতোই কেউ বেড়িয়ে আসে। ছবি অনুযায়ী গিরিধারীর একগাল দাড়ি বা মাথায় টুপি কিছুই নেই এবং মুখটাও বেশ বয়স্ক। সঙ্গে সঙ্গে পঞ্জাব পুলিশে খবর যায়। তারপর গিরিধারীলালকে গ্রেফ্‌তার করা হয়।


শীতের রাতের চাঁদটার একাকিত্ত্ব যেন নিজের মধ্যেও অনুভব করতে পারছেন মুকুন্দলালজী। আজ ঠান্ডা কত হবে? বোধহয় বছরের শীতলতম দিন। মেয়ের সাথে আজও খাওয়ার সময় একটাও কথা হয় নি। এই সময় স্ত্রী সরলা কাছে থাকলে ভালো হতো। সে এখন দিল্লীতে কন্‌ফারেন্সে। জৈ কিছুতেই বুঝতে চাইছে না এই গ্রেফ্‌তার করা ছাড়া তার উপায় ছিলো না। গিরিধারী যে সন্ত্রাসবাদী তা তিনিও বিশ্বাস করেন না। তেমন কোনো প্রমাণ না থাকলেও ছবিটা এতোটা মেলে কি করে? ছেলেটাকে খুব পছন্দ ছিল তাঁর। জৈয়ের তো বটেই। সরলারও। এ বাড়িতেও তো আসতো। কথাবার্তা মার্জিত ধরণের। যখন জীপে তোলা হচ্ছে তখন প্রায় কেঁদে ফেলে বলেছিলো, ‘আমার কি দোষ স্যার?’ সন্ত্রাসবাদীরা ইমোশনাল হয় নাকি?


এদিকে ওপরতলার হুকুম। এইরকম দেশের অবস্থা। আতঙ্কগ্রস্ত। কোন ঝুঁকি নেওয়াও যায় না। মনজিৎ সিং-এর পাঠানো ফাইলগুলোতে বিস্ফোরণের বর্ণনা, আটক সন্ত্রাসবাদীদের বর্ণনায় এই আড়ালের নেতা যে একজনই তা বেশ বোঝা যায়। বিস্ফোরণের প্রকৃতিগুলোও এক ধাঁচের। কিন্তু ঐ ছবিটার সাথে গিরিধারীর মিলই সব ওলোটপালোট করে দিলো।


পাহাড়ের এই গ্রামটা একটা আদিবাসীদের বসতি। ঝিলিক নদীর বুকে পায়ের পাতাডোবা জল কাচের মত পরিষ্কার। এপারে গ্রাম আর ওপারে জঙ্গলের গাছপালার থেকে মাঝে মাঝে বহুদুর থেকে গুলির শব্দ আসে। নিশ্চয় শিকারের।


আবু রিয়াদকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। জঙ্গলের এই তাঁবুটা মনুষ্য বসতি থেকে মাইল দুয়েক ভিতরে। এখানে চুপিসারে নতুনদের বন্দুক শিক্ষার সাথে চলে অস্ত্র সংযোজন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে আসা কালাশণিকভ। মোহাম্মদ রাজার ডাকা এই জরুরি মিটিং-এ এত রাতেও সব জিহাদী প্রায় উপস্থিত। হাসান আলম, আবদুল্লা, আব্‌দুল, আলি, হালিম সকলেই আবু রিয়াদের দিকে চেয়ে। সিদ্দিকি, এই জিহাদী দলের নেতা বেনারসে ধরা পড়েছে। সিদ্দিকি, প্রায় বছর তিনেক গোঁড়া হিন্দুর ছদ্মবেশে দেবধামে। সেখানকার ডিআইজিটার থেকে প্রায় এই দু’মাসে অনেক তথ্য যোগার করেছে। নিরাপত্তার ফস্‌কা গেড়ো দিয়ে ছক কেটে বারাণসীতে ঢুকে পড়েছে চার জিহাদি। এবার তাদের লক্ষ্য দেবধাম কাঁপিয়ে দেওয়া। সিদ্দিকি বছরে বার তিনেক এখানে আসে। এই দেশে পুলিশের মধ্যে কতজন যে জিহাদীদের কত তথ্য দিয়ে চলেছে সরকার টেরও পায় না। এই যে পঞ্জাবে এত বড় বিস্ফোরণ তারা ঘটালো, কার সাহায্যে?


এই প্রচন্ড শীতে দেওয়ালে কাঁপতে থাকা মশালের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই একটা বুদ্ধি মাথায় এসে যায় রিয়াদের। সিদ্দিকি ছাড়াও আরও যে দুজন ধরা পড়েছে তারা কেউ এখানকার নয়। শহস্র ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনো একটার। সেটা পঞ্জাবের। তারা কেউ সিদ্দিকিকে চাক্ষুষ দেখেনি। শুধু এই সংগঠনের ইস্তাহারে সিদ্দিকির যে ছবি থাকে সেটা দেখে থাকবে। সে ছবি সাত-আট বছরের পুরোনো। সেখানে ওর একগাল দাড়ি, মাথায় টুপি। এখনকার সাথে তার কোনো মিল নেই। তবু পুলিশগুলো ওকে ধরলো কি করে?


সুতরাং যে বর্ণনা তারা দিয়েছে তা নিশ্চয় সাত আট বছরের পুরোনোটাই। এই ছবিছাড়া সিদ্দিকির কোনো তথ্যই পুলিশের জানা নেই। এটা তো পুলিশেরই বেশ উঁচু পদের একজন বলেছে।


এইসব ভাবতে ভাবতেই রিয়াদ ঠিক করে ফেলে কি করতে হবে।

গিরিধারীলালের মনে হলো মহাদেবজী মুখে চেয়েছেন। সকালে খবরটা পেয়েও সে বিশ্বাস করতে পারে নি। মুকুন্দজী নিজে তাকে খবর দেন যে ভুল সন্দেহে তাকে হেনস্থা করা হয়েছিলো। এর জন্য তিনি লজ্জিত। আসল লোক শ্রীনগরে ধরা পড়েছে। গিরিধারীলাল মুকুন্দজীকে বলেছেন,
- না মুকুন্দজী। আপনার কাজ আপনি করেছেন। আপনার কি দোষ।

আবু রিয়াদের মাথার দাম কি টাকায় হিসেব করা যাবে? সিদ্দিকিকে ছাড়াতে তিনি যে মোক্ষম চালটা দিলেন তাতেই উল্টে গেলো পুলিশ। তার কথাতেই ঠিক হয় সেইদিন বৈঠকের পর সিদ্দিকির ছোটভাই রেহানকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এতে তার জান গেলেও পরোয়া নেই। জিহাদীরা মৃত্যুকে ভয় করে না। সাত বছর আগের সিদ্দিকি যেন এখনকার রেহান। হুবহু এক। রেহানকে ধরলে নিশ্চয় সিদ্দিকিকে ওরা ছেড়ে দেবে!


উজ্জৈনী খুব খুশী। আজ বাবার সাথে প্রচুর কথা হচ্ছে তার। মুকুন্দলালও আনন্দে। গিরিধারীকে তিনি ঠিকই চিনেছিলেন। সে সন্ত্রাসবাদী নয়।


জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গিরিধারীর মনে হচ্ছে এইরকম তুখোর বুদ্ধি আবু রিয়াদ ছাড়া আর কারো না। লোকটা কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের চেহারা বদলে দিতো। সে যে নিজে সিদ্দিকি এটা সে নিজে ছাড়া জানেন সায়রা আর আরিক। মানে মীরা দেবী আর পরেশনাথ। এরা সকলেই জঙ্গি সংগঠনের এক একটা মাথা। এখানে ছদ্মবেশী।


সে এখন মুক্ত। আর বিস্ফোরণ ঘটাতে জিহাদীরা বেনারসে ঢুকে গেছে। এসবই মুকুন্দজীর কৃপায়।


এখন থেকে যে কোনোদিন দেবধাম কেঁপে উঠতে পারে!
Comments

busy