| বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ৭ |
|
এবার মনে মনেই আমি এক আশ্চর্য প্রশ্নোত্তর শুরু করলাম ওদের একজনের সঙ্গে। মনে মনে প্রশ্নের মনে মনে উত্তর। সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনো করেও কুমীর কৃষ যেটা বুঝতে পারেনি, অক্টোপাস-জেঠুর আশীর্বাদের কল্যাণে এবার সেটাই বুঝতে চলেছি, জানতে চলেছি আমি। উত্তেজনায় গায়ের আঁশগুলো সব খাড়া-খাড়া হয়ে গেলো আমার। শুধোলাম, ‘কৃষ কুমীরের অনুমানটাই ঠিক নাকি বক-বন্ধু? মানুষদের কিছু নৃশংস কাজকর্মের ফলেই কি তোমার এই হাল নাকি! কিন্তু তোমার স্মৃতিতে পৌঁছে আমি তো দেখতে পেলাম আকাশ ভর্তি করে মস্তি মেরে তোমাদের ওড়াউড়ির দৃশ্য। এরপরে এমন কী ঘটে গেলো যে তুমি একেবারে ট্রমার মধ্যে চলে গেলে!’ গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, ঠোঁট একটুও না নাড়িয়ে, মন থেকে মনে কথার উত্তর দিলো বক বন্ধু, ‘ওই দৃশ্যটা দিয়ে তো গল্পের শেষ নয় রে ভাই, গল্পের শুরু। হ্যাঁ, সেই সকালটাও ঠিক ছিলো আর পাঁচটা সকালের মতোই। ওড়া, মজা আর বিন্দাস লাইফ কাটানো। ঝাঁক বেঁধে সবাই মিলে ওড়ার সময় আমি আর আমার বন্ধুনী এলি উড়ছিলাম আবার একটু আলাদা আলাদা। সবার মধ্যে আছি, কিন্তু কারু মধ্যে নেই। আর সবাই ওড়ার আনন্দ যতখানি পাচ্ছিলো, এটুকু বলতে পারি, আমি আর এলি পাচ্ছিলাম তার দ্বিগুণ। এ একটা আশ্চর্য অনুভুতি গো মাছ-ভাই, এ আমি তোমায় বলে বোঝাতে পারবো না।’ এই অব্দি শোনার পরে আমি একবার চোখ তুলে তাকালাম বকটার দিকে। আচ্ছা ও কি টের পাচ্ছে যে, আমি ওর মন পড়ে ফেলছি? ও টের পাচ্ছে কি যে, ওর সঙ্গে মনে মনে সংলাপ চলছে আমার? মানে, বলতে চাইছি, এসব কিছু আসলে সত্যি সত্যি ঘটছে তো? নাকি সবই আমার কল্পনা। একটু দ্বিধা-দ্বন্ধের দোটানাতেই যেন বা পড়ে গিয়েছিলাম, এমন সময় চমকে উঠে দেখলাম, ওই বক-বন্ধুর চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো কৃষ-কুমীরের পিঠে। আর বহু-উ-উ দুর থেকে কেউ যেন আমায় বললো, - আমার জীবনের বাকি আধখানা শুনবে না? আমি তড়ি-ঘড়ি বললাম, ‘কী যে বলো, শুনবো না মানে? বলো, তারপর কী হলো। দিগন্ত চরাচর ভরে গেলো তোমাদের গোটা দলটার আর্তচীৎকারে। এই অব্দিই বলেছো তুমি।’ ‘গোটা দলটার আর্তচীৎকার বলেছি বুঝি? না গো। তার থেকে দুটো নাম বাদ দাও। আমার আর আমার বন্ধুনীর। বলছিলাম না আমরা উড়ছিলাম একটু আলাদা আলাদা-আর এভাবেই মাঝে মাঝে তৈরি করে নিচ্ছিলাম দুজনের নির্জনতার বলয়- তাতে লাভ হলো এই যে, আমরা দুজন ফস্কে বেরিয়ে গেলাম নিষ্ঠুর দু-পেয়ে প্রাণীর জালের ফাঁদ থেকে।’ ‘যাক। একে কী বলবে বলো তুমি। সৌভাগ্য নাকি ভগবানের আশীর্বাদ?’ ‘আশীর্বাদ এটাকে যদি আশীর্বাদ বলবো, তাহলে অভিশাপ বলবো কাকে? সৌভাগ্য। হে ঈশ্বর, এমন সৌভাগ্য যেন আমার সবচেয়ে বড় শত্রুরও না হয়। যদি ঘরা পড়তা, যদি বন্দি হতাম, তাহলে অন্তত যে দৃশ্যগুলো দেখে আজ আমরা দুজনেই জড়বৎ মৃতবস্তু হয়ে গেছি, তা তো হয়ে যেতে হতো না। হ্যাঁ মরেই যেতাম হয়তো এতক্ষণে। কিন্তু এমন দৃশ্য দেখার চেয়ে, এমন দৃশ্যের স্মৃতি চোখে নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুও যে বেশি সুখকর।’ এতগুলো বক ধরে কী করবে ওই মানুষেরা, সেই কৌতূহল মাথায় প্রায় চড়ে যাচ্ছিলো বলতে পারো। তাই প্রায় জীবনের বাজি রেখে ঠিক করলাম, একটা অ্যাডভেঞ্চার করবো। চুপি চুপি মনুষদের আস্তানায় হানা দিয়ে দেখবো, কোন কাজে লাগবে ওদের এতগুলো বক। এলিকে বললাম, তুমি উড়ে পালাও এলি। এ বড় সর্বনাশা খেলা। এ খেলায় সাথী হয়ো না তুমি। এলি উত্তরে বললো, অন্তু, কী করে ভাবলে যে এমন একটা সময়ে তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে পারবো আমি? বলো-ভাবতে পারলে কী করে? তুমি যেদিন প্রথম আমার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করলে, সেই গতবছর চৈত্রমাসে, তখনই তো তোমার চোখে আমার সর্বনাশ দেখতে পেয়েছিলেম আমি। আর আজ বুঝি সেই সর্বনাশেরই দিন। তবু- যা হবার হয় হোক-আমি তোমার সাথী হয়েই রয়ে যাবো। আমি এতটা শুনে বললাম, ‘এই দৃশ্য দেখেই তোমরা দুজনে এমন বোবা হয়ে গেছো? অন্তু, তোমায় কী বলবো জানি না। একটা প্রশ্নের উত্তর কিন্তু পাচ্ছি না। মানুষেরা অত বক হঠাৎ করে মারতে গেলো কেন? মানুষের মাংসের মধ্যে মাংসের লোভ কাজ করে জানি। কিন্ত উতাই বলে স্রেফ খাবার জন্যেই এই সব কিছু মেনে নিতে যেন কেমন কেমন লাগছে...।’ ‘আমার গল্প কিন্তু এখনও শেষ হয় নি মাছ-ভাই। হ্যাঁ, তোমার দোষ নেই কোনো, প্রথমটায় বিস্ময়ে হকচকিয়ে গেছিলাম তো আমি নিজেই। তোমার মতো করেই ভাবছিলাম, মারা তো হলো, এবারে এতগুলো বক নিয়ে করবেটা কী মানুষগুলো। এত রক্ত, এত ছুরির ঝিলিক কি এদের একজনেরও মাঝরাতের স্বপ্নে ধীরে সুস্থে এসে বসবে না? সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলো এরপরেই। মৃত বকদের শরীর-ভর্তি সেই জল-ভরা ড্রামটা লোকগুলো ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিলো একটা গণগণে উনুনের ওপর। ব্যাস, তারপরে আগুন এসে ছ্যাঁকা দিতে লাগলো ড্রামটার তলায়, ড্রামটা বললো, আমি একলা কেন ছ্যাঁকা খাবো, আয় রক্তে-ভ।এজা-জল, তুইও একটু ছ্যাঁকা খা, ব্যাস, ছ্যাঁকা খেলো জলও, তারপর বুগবুগিয়ে ফুটতে লাগলো জল, আর আমার চোখের সামনে সেদ্ধঘ হতে থাকলো আমার মা-বাবা-ভাই-বোন-চেনাশুনো সব্বাই। গাছের পাতার অন্ধকার আড়ালে ছিলাম আমরা দুজন, সেখান অব্দি এসে পৌঁছল বকের মাংস সেদ্ধ হবার ঘ্রাণ। আমরা দুজনেই তখন এই দৃশ্য দেখে আতংকে শিহরিত, এইসময় যোগ হলো আরেকটা নতুন ঘটনা। মানুষেরা তড়িৎবেগে এবার একটা একটা মুতদেহ তুলতে লাগলো ড্রাম থেকে-তারপর ক্ষিপ্রহস্তে ছাড়িয়ে নিতে লাগলো তার শরীরের পালকগুলো, তারপর পালক-ছাড়ানো-সেদ্ধ বকরে শরীরটা ছুঁড়ে ফেলতে লাগলো অন্য একটা পাত্রে। একপাশে জমা হতে লাগলো সেদ্ধ-আধসেদ্ধ মাংসের স্তুপ, আরেকপাশে নরম সাদা পালকের স্তুপ। এইটুকু দেখার পরে সেই রাতেই বমি এসে গেছিলো আমার। মামণি-বাপিকে এইভাবে বীভৎসভাবে মারা যেতে দেখবো, এমনটা কি কখনো দুঃস্বপ্নেও ভেবেছিলেম। এরপরেই আমি জ্ঞান হারাই!’ ‘কিন্তু তারপরে কী হলো অন্তু? অত পালক দিয়ে মানুষেরা তাহলে কী করলো, সেটা তাহলে আর জানাই গেল না! কী ভীষণ ধাঁধাঁর মতো যে এখনও লাগছে এই গোটা ব্যাপারটা। এতো পালকের স্তুপ নিয়ে করবেটা কী মানুষগুলো?’ (এর পর আগামী সংখ্যায়) Comments | |
View all articles by this author |
|