উত্তরণ - পর্ব ১৩

এর আগে

সময় কিন্তু থেমে নেই।
দিনগুলো ঝড়ের বেগে কেটে যাচ্ছে।
কোথা দিয়ে যে এতগুলো মাস কেটে গেল স্নিগ্ধা নিজেই জানেনা।
আজ সেই দিন।
আজ স্নিগ্ধা চিরদিনের জন্য এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।
এই সেই বাড়ি।
সময় কিন্তু থেমে নেই।
দিনগুলো ঝড়ের বেগে কেটে যাচ্ছে।
কোথা দিয়ে যে এতগুলো মাস কেটে গেল স্নিগ্ধা নিজেই জানেনা।
আজ সেই দিন।
আজ স্নিগ্ধা চিরদিনের জন্য এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে।
এই সেই বাড়ি।

এই বাড়িতে ও একদিন নতুন বউ হয়ে প্রথম পা দিয়েছিল। অনেক ঘটনার সাক্ষী এই বাড়ি। আজ এই বাড়ি শুধু স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিঃস্ব স্নিগ্ধা আজ এই বাড়ির দরজা দিয়ে চিরদিনের জন্য বেরিয়ে যাবে। সাথে করে নিয়ে যাবে কিছু সুখ, কিছু হারিয়ে যাওয়া দুঃখ।

মানুষতো এমনই হয়।

সে যখন নতুন জীবনের সন্ধানে যায়, নিয়ে যায় কিছু স্মৃতি, ফেলে যায় কিছু সুখ-দুঃখ। আঁকড়ে থাকা দুঃখগুলো কেমন করে যেন মন থেকে হারিয়ে যায়। কাঁপা কাঁপা বুকে নতুন সুখ এসে বাসা বাঁধে। জীবন নতুন ভাবে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে চায়। হয়ত নতুন সুখের জন্যই মানুষের এই পথ চলা।

স্নিগ্ধার পথ চলাও হয়ত সেই রকম এক সুখের সন্ধানে।
বুকের মধ্যেটা কাল রাত থেকেই কাঁপছে।
কেমন হবে ওর এই পথ চলা?
নতুন দেশ।
অচেনা মানুষ।
অচেনা পরিবেশ।

বুকের মধ্যেটা কেমন যেন দুরদুর করে ওঠা নামা করছে। কিছুতেই সেই কাঁপুনিটা থামাতে পারছেনা। রাত্রে ভাল ঘুম হয়নি। বারবার উঠে জল খেয়েছে। পাশের ঘর থেকে মাসি একবার উঠে এসে জিজ্ঞেস করেছেন যে স্নিগ্ধার শরীর খারাপ লাগছে কিনা। স্নিগ্ধা মাসিকে বুঝিয়ে সুজিয়ে ঘুমতে পাঠিয়েছিল।

আজ সারাটা দিন এটা ওটা গোছাতে গোছাতেই কেটে গেছে।
একবার সমু হাসতে হাসতে স্নিগ্ধাকে বলল- বৌদি, এত গুছিয়ে কি হবে? আর কিছুক্ষুণ পরেই তো তুমি চলে যাবে, এসব আর গোছাতে হবেনা।
না সমু, গুছিয়ে না গেলে মাসির খুব কষ্ট হবে। ওনাকে তো একা একাই সব করতে হবে। একটু গুছিয়ে দিয়ে গেলে ওনার সুবিধা হবে।

মাসি খাটের ওপরে বসে স্নিগ্ধার সুটকেসটা গোছাচ্ছিলেন। কথাটা শুনতে পেয়ে বললেন- স্নিগ্ধা ওসব রাখতো এখন। ও আমি পরে আস্তে আস্তে সব গুছিয়ে ফেলব। এখন আয় আমার কাছে এসে বস। কতদিন তোকে আর দেখতে পাবনা। তুই আমার মেয়ে। আজ তুই চলে যাচ্ছিস। আয় কাছে এসে বস তোকে একটু ভালো করে দেখি।

স্নিগ্ধার মনটা কেমন যেন হুহু করে উঠল। চোখগুটো ছলছল করতে লাগল। আস্তে আস্তে মাসির পাশে গিয়ে খাটের কোনায় বসল।

কোনো কথা না বলে চুপ করে বসে রইল স্নিগ্ধা। চোখদুটো সুটকেসের দিকে নামানো। কিন্তু কোনো কিছুই চোখে আসছেনা। শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চারিপাশটা যেন অসম্ভভ নিস্তব্ধ। কোনো শব্দ নেই। একটা শব্দহীন ঘরে স্নিগ্ধা যেন একা বসে আছে। এই মুহুর্তে পৃথিবীতে কোনো প্রাণের অস্তিত্ব নেই। মনটা সম্পূর্ণ চিন্তাহীন। মন একদম ফাঁকা। শুধু নিজের নিঃশ্বাসের শব্দটা কানে আসছে। কোনো চিন্তাই মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছেনা।

‘আচ্ছা মানুষ কি চিন্তাশুন্য থাকতে পারে? মানুষ যখন জেগে থাকে তখন কোনো না কোনো চিন্তা মানুষকে ছুঁয়ে থাকে। তাহলে আমার মনে কেন কোনো চিন্তা আসছেনা?’ এই চিন্তাটাই স্নিগ্ধাকে বারবার ধাক্কা দিতে থাকল।

কি ভাবছিসরে?
মাসির কথায় স্নিগ্ধার মানুষের চিন্তা নিয়ে চিন্তাটা ছিঁড়ে গেল।
কিছুই ভাবছিনা মাসি।
তাই আবার হয় নাকি? মানুষ কিছু না ভেবে আবার থাকতে পারে নাকি?
সত্যিই কিছু ভাবছিনা।
একটু সময় চুপ করে থেকে স্নিগ্ধা আবার বলল-মাসি, আমি কি তোমাকে একটু হেল্প করব?
তোকে কিচ্ছু করতে হবেনা। তুই শুধু আমার কাছে বসে থাক।
মাসি, আমি তোমাকে ছাড়া থাকব কি করে?
যে ভাবে আমি থাকব। দেখ, সময় মানুষকে আস্তে আস্তে সব সহ্য করিয়ে দেয়। তুই ও দেখবি নতুন জায়গায় আস্তে আস্তে মানিয়ে নিয়েছিস। আমরা আস্তে আস্তে তোর কাছে ফিকে হয়ে যাব।
মাসির কথায় স্নিগ্ধা আর থাকতে পারলনা। মাসিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মাসিও একহাত দিয়ে স্নিগ্ধাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
দুজনে কতক্ষণ এরকম ভাবে ছিল নিজেরাই জানেনা। হঠাৎ সমুর কথায় দুজনেই চমকে উঠল।

কি হল তোমরা আবার কাঁদতে আরম্ভ করলে কেন? আরে বাবা কাঁদার সময় অনেক পাবে জীবনে, এখন তাড়াতাড়ি করে সব গুছিয়ে নাও। বৌদি, তুমি উঠে চানটা করে নাও। তোমরা আর দেরী কোরোনা, তা হলে সবদিকে দেরী হয়ে যাবে।

কথাটা বলে সমু আবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

মাসি একবার স্নিগ্ধার চিবুকটা ধরে ওর মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন। ভালো করে স্নিগ্ধার মুখটা দেখে নিয়ে ওর চোখের জল নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে বললেন- যা মা, এবারে চানটা করেনে। তানাহলে সত্যিই দেরী হয়ে যাবে বেরতে।

স্নিগ্ধা খাট থেকে নেমে বাথরুমের দিকে চলল।
মাসি আবার সুটকেস গোছানোয় মন দিলেন।
স্নান করে বাথরুম থেকে বেরিয়ে স্নিগ্ধা মার ঘরে গেল।

ঘরটা আজ সকালেই স্নিগ্ধা মনের মত করে গুছিয়েছে। মা ঠিক যেমনটা চাইতেন, সেই ভাবেই ঘরটা সাজিয়েছে। খাটে একটা সবুজ রঙের লতাপাতা আঁকা চাদর পাতা। সমুর এনে দেওয়া লাল গোলাপের কুঁড়িগুলো একটা ফুলদানিতে সুন্দর করে সাজানো। খাটের ওপরে মার শেষ বয়সের একটা ছবি। মা ঠোঁট চেপে হাসছেন। অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছেন। ছবিটা যেদিক থেকেই দেখা যায় মনে হয় মা সেই দিকেই তাকিয়ে আছেন।

স্নিগ্ধা মার খাটের একটা ধারে দিয়ে বসল চিরুনি হাতে নিয়ে। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ছবিটার দিকে তাকাল।

মা একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। মা কি কিছু বলতে চাইছেন? স্নিগ্ধার মনে হল মার ঠোঁটদুটো যেন একটু নড়ে উঠল। একটা মিষ্টি গন্ধ স্নিগ্ধার নাকে এসে লাগল। মা যে পারফিউমটা মাখতেন এটা সেই পারফিউমের গন্ধ। কেমন যেন একটা ভালো লাগা হচ্ছে মনের মধ্যে।

গন্ধটা যেন খুব কাছ থেকে আসছে। স্নিগ্ধা একবার সারা ঘরটা দেখে নিল। না কেউ কোথাও নেই। তাহলে কি মা এসেছেন। মাথাটা নিচু করে চোখদুটো বন্ধ করল স্নিগ্ধা। একটা আবেশে সারা শরীরটা অবশ হয়ে আসছে।

হঠাৎ পাশের ঘরে ফোনটা ঝনঝন করে বেজে উঠল।
চমকে উঠে দাঁড়াল স্নিগ্ধা। এক মূহুর্তে ঘোরটা কেটে গেল। পাশের ঘরে মাসি ফোনটা ধরেছেন। কারো সাথে বেশ চিৎকার করে কথা বলছেন।
স্নিগ্ধা, স্নিগ্ধা এদিকে আয় অনু ফোন করেছে।
আসছি মাসি।
স্নিগ্ধা পাশের ঘরে গেল।
আমেরিকা থেকে অনিরুদ্ধ ফোন করেছে।
ফোনটা হাতে নিয়ে স্নিগ্ধা একটা সোফায় বসল।
হ্যালো, কে দাদা?
হ্যাঁ, আমি দাদা বলছি। সব ঠিকঠাক তো স্নিগ্ধা?
হ্যাঁ দাদা।
আর তো কিছুক্ষণ পরেই বেরবে, তাই না?
হ্যাঁ।
এখানের এয়ারপোর্টে নেমে ইমিগ্রেসনের ঝামেলা মিটিয়ে বাইরে এলেই আমাকে দেখতে পাবে। কোনো চিন্তা কোরোনা।
সাবধানে আসবে।
হ্যাঁ দাদা।
আমার ফোন নম্বারটা সাথে রাখবে, দরকার হলে আমাকে কালেক্ট্ কল্ করবে। তোমার কোনো পয়সা লাগবেনা।
ঠিক আছে।
দেখা হবে। গুড লাক্। বাই।
বাই।
ফোনটা রেখে স্নিগ্ধা মাসির দিকে তাকালো। কোনো কথা না বলে হাত পা ছেড়ে দিয়ে অলস ভাবে সোফায় বসে রইল।
মাসি স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বললেন,- আর বসে থাকিসনা মা। রেডি হয়েনে। আমার সুটকেস গোছানো শেষ।
স্নিগ্ধা মাসির দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল-মাসি আমার কাছে একটু এসে বসনা। ভীষণ ভয় করছে আমার।
ভয় করছে? কেন?
জানিনা।
কিচ্ছু চিন্তা করিসনা মা, সব ঠিকঠাক হবে। এখন ওঠ, রেডি হয়েনে। আমি সবার খাবারটা বাড়ি। আর তো সময় নেই, ঘন্টা দু-একের ভেতরেই আমাদের বেরতে হবে।

স্নিগ্ধা কাঁপা কাঁপা বুকে ক্লান্ত ভাবে উঠে দাঁড়াল। কোনো রকমে পা দুটোকে টেনে নিয়ে আলমারির সামনে এসে একটা পাল্লা খুলে হালকা ঘিয়ে রঙের সিফনের শাড়িটা বার করল। গতকালই ঠিক করে রেখেছিল এই শাড়িটা ও পরে যাবে। এই শাড়িটা গতবারের পুজোয় মা দিয়েছিলেন।

স্নিগ্ধা শাড়ি, ব্লাউজ আর সায় বুকের মধ্যে নিয়ে মার ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিল।

(এর পর আগামী সংখ্যায়)

Comments

busy

অনুপম
About the author: