উত্তরণ - পর্ব ১২

এর আগে

আজ অনিরুদ্ধর ফিরে যাবার দিন।

সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে অনিরুদ্ধ বারান্দায় এসে বসল। রাস্তায় এখনো লোকজন বেশি নেই। সূর্য্য সবে পূবের আকাশে উঁকি দিয়েছে। কিছু শালিক বাগানে কি যেন খুটে খুটে খাচ্ছে আর কিচির মিচির করছে। বাড়ির সামনে রাস্তার ইলেকট্রিকের তারে একটা কাক বসে তারস্বরে কা কা করছে।
    স্নিগ্ধা এখনো ওঠেনি।

অনিরুদ্ধ চুপচাপ বসে আছে শুন্য দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে। হঠাৎ চোখটা পড়ল রাস্তার উল্টোদিকের কৃষ্ণচূড়া গাছটায়। ছোটবেলায় ও একটা কবিতা লিখেছিল ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটাকে নিয়ে। আজ আর কবিতার লাইনগুলো মনে নেই। শুধু মনে আছে ওই গাছটা ওর খুব ভালো লাগত। প্রায়ই ও গাছটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকত। খুব যখন ছোট তখন কৃষ্ণচূড়ার ফুলের কুঁড়ি রাস্তার থেকে কুড়িয়ে তার খোসাটা ছাড়িয়ে ভেতর থেকে মাথাওলা শুঁড়গুলো নিয়ে বন্ধুদের সাথে কাটাকুটি খেলত। যার শুঁড়ের মাথা খসে যেত সেই কাটাকুটি খেলায় হেরে যেত।

অনিরুদ্ধ নিজের মনেই হেসে উঠল। ছোটবেলায় কত কিছু হাবিজাবি খেলাই ওরা খেলত।
আজকালকার বাচ্চারা কি কৃষ্ণচূড়ার কুঁড়ি নিয়ে ওই খেলাটা খেলে? ওরা কি জানে এরকম একটা খেলা আছে?
    অনিরুদ্ধর খুব জানতে ইচ্ছে করছে এখনকার বাচ্চারা ওই খেলাটা খেলে কিনা।
    আচ্ছা স্নিগ্ধা কি জানে এরকম একটা খেলা আছে?
    অনিরুদ্ধ মনে মনে বলল, যাবার আগে স্নিগ্ধাকে কথাটা জিজ্ঞাসা করতে হবে।
    মা-ও খেলত এই খেলাটা অনিরুদ্ধর সাথে।

ছুটির দিনে দুপুরে অনিরুদ্ধ গাছটার তলা থেকে কুড়িয়ে আনত দুহাত ভর্তি কুঁড়ি। তারপর দুপুরের খাওয়ার পর ও আর মা বারান্দায় বসে শুঁড়গুলো নিয়ে কাটাকুটি খেলত। মা খুব মজা পেত খেলাটা খেলতে। মাঝে মাঝে বিকেলে অনিরুদ্ধকে ডেকে মা বলত, ‘মনু যা কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলা থেকে কিছু কুঁড়ি কুড়িয়ে আন, আমরা দুজনে কাটাকুটি খেলব।’ খেলতে খেলতে কারো শুঁড়ের মাথা কেটে গেলে মা খুব হি হি করে হাসত।

অনিরুদ্ধর এখন ইচ্ছা করছে ওই খেলাটা খেলতে। ইচ্ছা করছে ফিরে যেতে আবার সেই ছোটবেলায়। ইচ্ছা করছে মাকে কাছে পেতে। ইচ্ছা করছে মা’র কোলের ওপরে চুপ করে বসে থাকতে।

-মা।

খুব আস্তে অনিরুদ্ধ ডাকল মা বলে। মা কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসার পর সারা গাটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল। চোখটা আকাশের দিকে তুলে নীল গভীর আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকল।

    সত্যিই কি মানুষ মারা যাবার পর আকাশে চলে যায়?
    ‌স্বর্গ কি আকাশে?
    মা এখন কোথায়? মা কি ওকে দেখতে পাচ্ছে? মা কি বুঝতে পারছে যে অনিরুদ্ধর কষ্ট হচ্ছে?
    ‌মাকে না পাওয়ার কষ্ট। মাকে একটু ছোঁয়ার জন্য মনটা ছটফট করতে লাগল। লম্বা শরীরটা বেতের চেয়ারে বসে কেমন যেন শিশুর মত ছটফট করছে।

চোখদুটো হঠাৎ ঝাপসা হয়ে উঠতে অনিরুদ্ধ তাড়াতাড়ি দুহাত দিয়ে চোখ মুছে নিল। ও বুঝতেই পারেনি কখন চোখে জল এসেছে।
‌    তেরোবছর মাকে না দেখার কষ্টটা আজ ওকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
   ‌ অনিরুদ্ধ কি করে মাকে তেরোবছর না দেখে ছিল?
    ‌নিজের সেই ইচ্ছাকৃত ভুলের মাশুল আজ ও দিচ্ছে। অনিরুদ্ধ বুঝতে পারছে, এই কষ্টটা ওকে সারা জীবন কুরে কুরে খাবে। মাকে দেখতে না পাওয়ার, মাকে ছুঁতে না পাওয়ার কষ্টটা ওকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

-দাদা চা।
    অনিরুদ্ধ চমকে উঠে ডান পাশে তাকাল।
    ‌স্নিগ্ধা চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‌অনিরুদ্ধ তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা নিল।
‌-দাদা আপনি কি অনেকক্ষণ উঠেছেন?
-খুব সকালে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল আর ঘুম এলনা, তাই বারান্দায় এসে বসেছি।
‌    স্নিগ্ধা একটু লজ্জা পেল। লাজুক গলায় বলল- আমাকে ডাকলেননা কেন, আমি চা করে দিতাম?
-তখন চা খাওয়ার কোনো ইচ্ছা করছিলনা। তাছাড়া অত ভোরে উঠে তুমি কি করবে?
-আমি খুব দেরীতে ঘুম থেকে উঠি। আমার খুব বাজে লাগছে, আপনি কত সকালে উঠেছেন, কিন্তু এখনো চা খাননি।
-স্নিগ্ধা, চায়ের ব্যাপার নিয়ে মন খারাপ কোরোনা। সত্যিই আমার চায়ের কথা মনে আসেনি। আজকে আমি চলে যাব, তাই আজকের সকালটা আমি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছি। এই চেয়ারটায় বস, তোমার সঙ্গে চলে যাবার আগে একটু গল্প করে নিই।
‌-দাদা, এক মিনিট সময় দিন, আমি একটু আসছি রান্নাঘর থেকে।
    স্নিগ্ধা চলে গেল।
    অনিরুদ্ধ বেশ আয়েশ করে চায়ে একটা চুমুক দিল।

স্নিগ্ধাকে দেখে একটু আগের কষ্টটা চলে গিয়ে মনটা বেশ হালকা লাগছে। স্নিগ্ধা যখন কাছে থাকে তখন মনটা বেশ ভালো লাগে। সকালের এই ভালো লাগাটা সারাটা দিনকে ভরিয়ে রাখে।

চায়ের কাপে আর একটা চুমুক দিল অনিরুদ্ধ। অলস ভাবে এলিয়ে রইল চেয়ারটায়। মনটা আবার একটু অস্থির অস্থির করছে। আজ যাবার দিন। রাত্রে ফ্লাইট্ দমদম এয়ারপোর্ট থেকে। সমু আর মাসি একটু পরেই এ বাড়িতে চলে আসবে। আজ সারাদিন ওরা এ বাড়িতে থাকবে। আজ আর কোথাও যাবার নেই। আজ শুধু অলস ভাবে দিন কাটানো আর গল্প করা। আবার কবে এদেশে আসবে অনিরুদ্ধ, তার কোনো ঠিক নেই।

‌    স্নিগ্ধা এসে একটা চেয়ারে বসল।
‌‌

ঠিক সেই মুহুর্তেই নিচে থেকে খবরের কাগজটা এসে বারান্দায় পরল। স্নিগ্ধা কাগজটা কুড়িয়ে অনিরুদ্ধকে দিল। অনিরুদ্ধ কাগজটা চেয়ারের পাশে মেঝেতে রাখল। স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে অনিরুদ্ধ বলল- এখন কাগজ পড়ব না। এখন তোমার সাথে গল্প করব।

‌    ‌স্নিগ্ধা কিছু না বলে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
-আজ চলে যাচ্ছি, মনটা বেশ খারাপ লাগছে।
-আমারো মন খারাপ লাগছে দাদা। আবার কবে আসবেন?
-এখানে আসবার আগে তুমি ওখানে যাবে।

স্নিগ্ধা লাজুক চোখে অনিরুদ্ধকে একবার দেখে নিল। তারপর শাড়ির আঁচলটা ধরে ডানহাতের আঙ্গুলে জড়াতে লাগল চোখ নিচু করে। বুকের মধ্যে ধড়ফড় করছে। বুকটা জোরে জোরে ওঠা নামা করছে। কেমন একটা ভালো লাগা অস্বস্তি হচ্ছে।

-আমি ওখানে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে তোমাকে স্পন্সরের কাগজ পাঠাব। তবে এখুনি পাঠাব না, কারণ এখন শীত পড়ে যাচ্ছে ওরা ভিসা দেবেনা। আমি সামনের বছর এপ্রিল মাসে কাগজ পত্র পাঠাব। সামারে ভিসা পেতে সুবিধা হবে। তারপর একবার ওখানে চলে আসতে পারলে একটা কিছু ব্যবস্থা করে ফেলা যাবে। সামনের বছর স্পন্সরের কাগজ পাঠালে কোনো অসুবিধা হবেনা তো?
-না না অসুবিধা হবে কেন?
-কোনো চিন্তা কোরোনা, দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি মাসিকে বলে দিয়েছি যত দিন না তোমার যাবার ব্যবস্থা হচ্ছে ততদিন মাসি রাত্রে তোমার কাছে এসে শোবেন।
-না না তার কোনো দরকার নেই। আমি ঠিকই থাকতে পারব, কোনো অসুবিধা হবেনা।
-আমি জানি তোমার কোনো অসুবিধা হবেনা, তবু আমি চাই মাসি তোমার কাছে রাত্রে থাকুন।
    স্নিগ্ধা আর কিছু না বলে চুপ করে থাকল।

অনিরুদ্ধ খালি চায়ের কাপটা মেঝেতে রাখল। ডানপাটা বাঁপায়ের ওপরে তুলে বেশ আয়েশ করে বসল। স্নিগ্ধার দিকে একটু সময় তাকিয়ে দেখল। মনটা কেমন যেন করে উঠল। এই মেয়েটা এখন একা একা এই বাড়িতে থাকবে, এটা ভেবেই কেমন যেন লাগছে। এতদিন মা ছিল। মা মারা যাবার পর হইচই এর ভিতর দিয়ে এই কটা দিন কেটে গেল। আজ অনিরুদ্ধও চলে যাচ্ছে। রাত থেকে স্নিগ্ধা একদম একা। এত বড় বাড়িতে কি করে থাকবে স্নিগ্ধা একা একা?

-স্নিগ্ধা তোমার যখনি কোনো কিছু দরকার হবে আমাকে ফোন করে জানাবে, কথা দাও।
-জানাবো দাদা।
-আমি চেষ্টা করব তোমাকে প্রতি সপ্তাহে ফোন করতে।
-হ্যাঁ দাদা প্লিজ ফোন করবেন। আমি আপনার ফোনের অপেক্ষা করব।
    অনিরুদ্ধ স্নিগ্ধার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
-দাদা, আমাকে একটা কথা দেবেন?
-কি বল।
-ওখানে গিয়ে আপনি নিজের দিকে দেখবেন। বেশি কষ্ট করবেননা। আপনার কোনো কিছু হলেই আমাকে জানাবেন। কথা দিন আমাকে।
-কথা দিলাম তোমাকে সব জানাব।
    অনিরুদ্ধর মনটা ভরে গেল। একটা ভালো লাগায় শরীরটা শিরশির করে উঠল।
‌    স্নিগ্ধার বুকের ভিতরটা ফুলে উঠল। একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এসে লাগছে। সেই ভালো লাগার গন্ধটা ভেসে আসছে।
    দরজায় কেউ বেল দিচ্ছে। কেউ বোধ হয় এসেছে। স্নিগ্ধা চেয়ার থেকে উঠে নিচে নেমে গেল। অনিরুদ্ধ চুপ করে বসে থাকল বারান্দায়। কে আবার এল এত সকালে?
    মাসি আর সমু স্নিগ্ধার সাথে উঠে এল দোতলার বারান্দায়।
    অনিরুদ্ধ ওদের দিকে তাকিয়ে বলল- তোমরা এসেছ? এস এস, বস।
    চেয়ার টেনে বসতে বসতে মাসি বললেন- কি করছিসরে অনু?
-কিছুই না মাসি। আমি আর স্নিগ্ধা বসে বসে গল্প করছি।
-দাদা তোমার এয়ারপোর্টে যাবার সব ব্যবস্থা রেডি। গাড়ি সময় মত এসে যাবে। সমু অনিরুদ্ধকে কথাটা বলল।
‌    ‌অনুরুদ্ধ সমুর দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখে বলল- থ্যাঙ্ক ইউ।
    স্নিগ্ধা একটু সময় ওখানে দাঁড়িয়ে পেছন ফেরে ভিতরে যাবার জন্য যেই পা বাড়িয়েছে, অমনি মাসি ওকে বললেন
-স্নিগ্ধা তুই আবার কোথায় চললি?
    স্নিগ্ধা আবার ওদের দিকে ফিরে বলল- মাসি আমি একটু তোমাদের জন্য চা করে আনি।
-না এখন চা করতে যেতে হবেনা। আমরা চা খেয়ে এসেছি। তুই এখানে এসে বস। আজ অনু চলে যাবে, আয় আমরা সবাই মিলে একটু গল্প করি।
-চা করতে বেশি সময় লাগবেনা।
-আমি জানি চা করতে বেশি সময় লাগবেনা। আমরা চা খেয়ে এসেছি, পরে ইচ্ছা হলে আবার খাব। আয়তো এখানে আমার পাশে বস এই চেয়ারটায়।
    স্নিগ্ধা কিছু না বলে হাসি হাসি মুখে মাসির পাশে একটা বেতের চেয়ার টেনে নিয়ে বসল।

চারজনে চারটে চেয়ারে বারান্দায় বসে। এক ফালি রোদ বারান্দার এক কোণে এসে পড়েছে। একটু সময় সবাই চুপচাপ বসে এ ওর মুখের দিকে দেখছে। কারো যেন কিছুই বলার নেই। সব কথা যেন শেষ হয়ে গেছে।
‌    ‌অনিরুদ্ধই নীরবতা ভেঙ্গে মাসির দিকে তাকিয়ে বলল- মাসি, তাহলে তুমি রাত্রে স্নিগ্ধার কাছেই থেকো?
-হ্যাঁরে থাকব। তোর কোনো চিন্তা নেই।
-কিছু দরকার হলেই আমাকে কিন্তু তোমরা জানাবে।
-হ্যাঁ জানাব। তাছাড়া আমরা তো আছিই, স্নিগ্ধার কিছু দরকার হলে আমরা তার ব্যবস্থা করব।
-হ্যাঁ দাদা কিছু চিন্তা কোরো না, আমরা তো আছিই। সমু অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে কথাটা বলল।
-অনু, তুই তাহলে ওখানে গিয়েই স্নিগ্ধার জন্য কাগজ পত্র পাঠাস? মাসি অনিরুদ্ধর দিকে একটু ঝুঁকে কথাটা বললেন।
-মাসি, গিয়েই আমি পাঠাব না। সামনের বছর এপ্রিল মাসে স্পন্সরের কাগজ পাঠাব।
-কেন?
-এখন পাঠালে কনস্যুলেট হয়ত ভিসা দেবেনা।
-কেন?
-ওরা হয়ত বলবে তুমি এত শীতে আমেরিকা গিয়ে কি করবে? তার চেয়ে সামারে ভিসার জন্য গেলে কোনো অসুবিধা হবেনা, কারণ তখন প্রচুর টুরিস্ট ওদেশে ঘুরতে যায়।
-বেশ তুই যা ভাল বুঝিস তাই করিস। কিন্তু তখন ভিসা পেতে কোনো অসুবিধা হবে নাতো?
-না। আমি গতকাল আমেরিকাতে মিসেস খান্না বলে আমার এক পরিচিত মহিলাকে ফোন করেছিলাম। তিনি এসব ব্যাপারটা খুব ভালো জানেন। উনিই বললেন সামারে ভিসার এ্যাপ্লাই করতে। ওই সময় নাকি টুরিস্টদের জন্য অনেক ভিসা দেয় কনস্যুলেট।
-বেশ তাহলে তাই করিস। তবে তোকে কিন্তু একটা কথা দিতে হবে?
- কি কথা মাসি?
-দেখ দিদি আমার হাত ধরে অনেকবার বলেছিল, ‘আমি যখন থাকবনা তখন তুই ওকে দেখিস। দেখবি স্নিগ্ধার যেন কোনো কষ্ট না হয়।’ অনু, তুই আমায় কথা দে এই মেয়েটাকে তুই দেখবি। ওকে কোনো কষ্ট পেতে দিবিনা। -মাসি, এসব কথা বাদ দাও। স্নিগ্ধা একটু অস্বস্তির সাথে কথাটা বলল মাসিকে।

মাসি স্নিগ্ধার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বললেন-বাদ দেব কিরে? এ তো শুধু দিদির ইচ্ছা না, এ আমারো মনের কথা। তুই কি জানিসনা, তুই আমার সব?
-জানি মাসি। তবু এখন এসব কথা বাদ দাও। আজ দাদার যাবার দিন, এখন অন্য কথা বল।
    অনিরুদ্ধ হাসি হাসি মুখে মাসির দিকে তাকিয়ে বলল- মাসি কোনো চিন্তা কোরোনা। স্নিগ্ধা সুখেই থাকবে।
-যাক নিশ্চিন্ত হলাম। মাসি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন।
    সারাটা দিন বেশ হইচই এর মধ্যে কেটে গেল।
    এখন অনিরুদ্ধর যাবার সময়।

গাড়ি এসে গেছে। ডিনার খাওয়া শেষ। সবাই এয়ারপোর্টে যাবার জন্য তৈরি। সুটকেস গাড়িতে উঠে গেছে। সমু নিচে গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে। মাসি আর স্নিগ্ধা সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে অনিরুদ্ধর অপেক্ষায়।

    আর অনিরুদ্ধ?

অনিরুদ্ধ মা’র ঘরে মা’র কম বয়সি ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ।
    মা যেন কিছু একটা বলতে চাইছে। কিন্তু অনিরুদ্ধ কিছুই শুনতে পাচ্ছেনা। মা’র কি ঠোঁটদুটো একটু নড়ে উঠল? মা’র চোখদুটো কি ছলছল করছে? অনিরুদ্ধর বুকের মধ্যে কেমন যেন করছে। একটা কান্না যেন বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
-মা আমি তোমায় শেষ দেখা দেখতে পেলামনা। তুমি কতবার আমাকে আসতে বলেছিলে কিন্তু আমি আসিনি। কেন আসিনি জানিনা। তোমার আমাকে না দেখতে পাওয়ার কষ্টটা আমি বুঝতে পারিনি মা। মা তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও। মা আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, স্নিগ্ধাকে আমি সারা জীবন দেখব। ওর দুঃখ কষ্ট সব আমি ভুলিয়ে রাখব। ওকে সুখী করব। ওর জীবন নতুন ভাবে শুরু করাব।
    অনিরুদ্ধার চোখদুটো ভিজে উঠল।
    মা কি হাসছেন? মা’র মুখে যেন একটা হালকা হাসির আভাস?
-অনু চল, দেরী হয়ে যাবে।

মাসির কথায় অনিরুদ্ধ তাড়াতাড়ি চোখদুটো মুছে নিল। আর একটু সময় মা’র ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছবিটা দেয়াল থেকে খুলে ডান হাতে বুকের কাছে ধরল। ছবিটা ও নিয়ে যাবে।
    ঘরটার চারিদিকে আর একবার ভালো করে দেখে নিল। মা’র নিজের ঘর।
    ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে স্নিগ্ধাকে বলল- স্নিগ্ধা আমি কি মা’র এই ছবিটা নিতে পারি?
    স্নিগ্ধা অবাক হয়ে অনিরুদ্ধর দিকে তাকিয়ে বলল- কেন পারবেননা? উনি তো আপনারই মা। হ্যাঁ দাদা ছবিটা আপনি নিয়ে যান।
-অনু, মা’র ছবি নিবি তার জন্য আবার এত কিন্তু কিন্তু কেন?

মাসির কথায় অনিরুদ্ধ ওনার দিকে তাকিয়ে বলল- আসলে আমি তো মা’র জন্য কিছুই করিনি তাই ছবিটা নিতে কেমন যেন বাধো বাধো হচ্ছিল।
-চল অনু আর দেরী করিসনা। ওদিকে দেরী হয়ে যাবে।
-হ্যাঁ চল।
    সিঁড়ি দিয়ে তিনজনে নিচে নামতে লাগল।

অনিরুদ্ধর লম্বা শরীরটা কেমন যেন সামনের দিকে ঝুঁকে আছে। যেন যাবার কোনো ইচ্ছাই নেই। কোনো রকমে পা টেনে টেনে নিচের দিকে নামতে লাগল। অত বড় শরীরটা কেমন যেন যন্ত্রনায় কুঁকড়ে আছে।

গাড়িতে ওঠবার আগে আর একবার বাড়িটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল অনিরুদ্ধ। তারপর গাড়ির পেছনে মাসির পাশে বসল। মাসির আর এক পাশে স্নিগ্ধা বসে। সামনের সিটে সমু।
    গাড়ি ছেড়ে দিল।
    লেকটাউন ছেড়ে গাড়ি হু হু করে ছুটে চলল দম্‌দম্‌ এয়ারপোর্টের দিকে।

(এর পর আগামী সংখ্যায়)

Comments

busy

অনুপম
About the author: