বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ৬

ছয়
এর আগে
নবমীর মাঝদুপুরে যখন ঝিলমিলের সঙ্গে একটু জলকেলি করার পর মা-বাবার কাছে ফিরছিলাম, তখন আরো একটা দৃশ্য দেখে আমার চক্ষু ছানাবড়া হবার যোগাড়। প্রথমে আমার চোখে পড়ে নি অবশ্য, ঝিলমিলই আমার নজর ফেরাল সেই পানে। পেটে হঠাৎ একটা ঢুঁসো মেরে বললো, ‘দেখেছ বুচান, তাকও একবার ওদিকে!’

আমি তাকালাম। তখন আকাশে পেঁজা তুলোর মতো রোদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে যেন নেমে আসছে জলের ভিতরে। ঠিক এমন একটা সময়ে আমি দেখলা, মাঝনদীতে নীরবে, নিথর হয়ে ভেসে যাচ্ছে একটা কুমীর। এত নিঃশব্দে ভাসছে, একপলক কেউ দেখলে ভাববে বুঝি বা পোড়াকাঠই ভেসে যাচ্ছে একটুকরো। সেই কুমীরের পিঠির ওপর পাশাপাশি বসে রয়েছে দুটো এইটুকুনি পুঁচকে সাদা বক। তারা উড়ে যাচ্ছে না, নড়াচড়া করছে না, বস্তুত কোনো দুষ্টুমির চিহ্নমাত্রই নেই তাদের মধ্যে। তারা যেন পাথর হয়ে গেছে। তারা যেন জীবন্ত নয়, তারা যেন স্ফটিকমূর্তি। কিম্বা তারা যেন খুব দক্ষ কোনো শিল্পীর হাতে অনেকক্ষণ সময়-নিয়ে-অনেক যত্ন নিয়ে বানানো কোনো নির্মাণ।

খুব গভীরভাবে যেন তারা ধ্যান করছে কোনো কিছুর, আর আমি কাছে গেলেই যেন বা সেই ধ্যানভঙ্গ হবার সম্ভাবনা। কী বলবো ওদের? চিত্রার্পিত নাকি ম্যানিকুইন!

ধ্যান ভেঙ্গে যাবার চান্স ছিলো জানি। তবু কুমীরের কাছে গিয়ে না শুধিয়ে পারি না, ‘কো গো তুমি?’ তারপর বললাম, ‘এদের দুজনকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে কোথায় চললে গো তুমি?’

কুমীরটা প্রথমে চেষ্টা করলো আমায় মোটে পাত্তা না দিতে। আমি তো এইটুকুনি পুঁচকি। আর ও হলো গিয়ে অ্যাত্তো বড়ো। পাত্তা দেবেই বা কেন। ইনফ্যাক্ট প্ল্যাঙ্কটনের থার্ড ল’-টা না থাকলে কপ্ করে আমায় বোধহয় মুখেই পুরে দিতো কুমীরটা। এখন অবশ্য কোনোরকম বেআইনি পথে হাঁটার চেষ্টা না করে চোখের ধার দিয়ে জাস্ট একটু দেখে নিলো আমায়। তারপর চলতে লাগলো, ঠিক যেমন চলছিলো এতক্ষণ, দুলকিচালে। কিন্তু আমিও কি আর এইটুকুনিতেই ছাড়ার পাত্তর? আমি ঘ্যানর ঘ্যানর করতেই থাকলা, ‘কই বললে না তো আমায়, কে তুমি আর কোথায়ই বা নিয়ে চলেছ এই বকদুটোকে?’

কুমীরটা তখন যেন নেহাৎ অনিচ্ছার সঙ্গেই মুখ খুললো। খুলে বললো, ‘আমার নাম কৃষ। ছোটবেলায় নাম ছিলো অবিশ্যি কৃষ্ণ, তারপর সব্বাইকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে বেড়াতে বেড়াতে একদিন আমি হয়ে গেলাম সুপারহিরো, আর লোকেও আমায় স্টাইল করে ডাকতে লাগলো কৃষ বলে।’ এরপর চোখ টেরিয়ে একটু নিজের পিঠের ওপর বসে থাকা বকদুটোকে একঝলক দেখার ভান করে বললো, ‘ওরাও মস্ত বিপদে পড়েছে কিনা, তাই ওদেরকে আমি উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছি।’

গল্পের, রহস্যের, অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়ে এবার আমায় রীতিমতো রড়ে-চড়ে উঠতে হলো। ওদের বিপদ হয়েছে মানেটা কী? ওই বকদুটোর বিপদ হয়েছে? কী বিপদ? কী করে হলো? কুমীরটাই বা কী করে তাদের সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছে? আর ওদেরকে নিয়ে ও এখন যাচ্ছেটাই বা কোথায়?

আমার মনের প্রশ্নগুলৌর কযেকটা বোধহয় কৃষ নিজে থেকেই আন্দাজ করতে পারলো। বললো, ‘ওদের আমি নিয়ে চলেছি দূরে কোথাও-অনেকটা দূরে-যেখানে চারপাশে শুধু সবুজ-শুধু জল, শুধু বাতাস আর প্রজাপতির পাখনায়-লেগে-থাকা ফুল-রেণুর বিচ্ছুরণ। এছাড়া সেখানে আর কিচ্ছুটি থাকবে না।’ তারপর আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো, ‘স্পেশালি সেখানো কোনো মানুষ থাকবে না, বুঝেছো?’

আমি ফের চোখ গোল-গোল করে বললাম, ‘কেন মানুষেরা কী ক্ষতি করেছে ওদের শুনি? ওরা কি মানুষ দেখেই ভয়-টয় পেয়েছে নাকি?’

কৃষ বললো, ‘কী জানো, সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও পুরোটা ডিটেলে জানি না। সকালবেলায় একটা গাঁয়ের নদীর চড়ায় উঠে একটু রোদ পোয়াচ্ছিলাম। রোদ্দুরের মধ্যে ভিটামিন ডি থাকে জানো বোধহয়। সেইসময় ওদের দুজনের সঙ্গে দেখা। ওরা দুজনে ঝটাপটি করে কোথা থেকে এসে উড়তে উড়তে গিয়ে আছড়ে পড়লো নদীর জলের মাঝখানে। আমি তো ভেবেছিলাম ফড়ফড়িয়ে ডানা-ফানা ঝেড়ে নিজেরাই জল থেকে উঠে পড়বে- ও হরি উল্টে নদীর এক ঘূর্ণিস্রোতে দুই মক্কেলই তলিয়ে গিয়ে অক্কা পায় আর কি। আমি তো দেখে থ। দুই ব্যাটা ডানা নাড়তেও ভুলে গেলো নাকি। আর ওড়ার বিদ্যেটাও কি মালদুটোর ব্রেন থেকে জাস্ট সাফ হয়ে গেছে! কি আর করি, দেখে শুনে অগত্যা আমাকেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হলো অ্যাকশনে। কৃষ!!! মুভির এই পার্টটার নাম, ব্যাক ইন অ্যাকশন। বাঁচালাম ওদের। আর তারপরে তো এই দেখতেই পাচ্ছো। দুই মূর্তিমানকে পিঠে বসিয়ে চলেছি কোথায় যেন বা। কোথায় যে যাচ্ছি, কোথায় গেলে যে শান্তির নিরাপদ একটা আশ্রয় খুঁজে পাবো, তার অবিশ্যি কুলকিনারা এখনো কিস্যু জানি না।’ আমার এতটা শুনে মনে হলো, কে জানে বাবা! যা দিনকাল পড়েছে, কৃষ আমার কাছে গুল মারছে না তো? তারচেয়ে বকদুটোকে সরাসরিই জিজ্ঞেস করা যাক না। তাই করলুম। খুবই বিনীতভাবে, ভারি মিষ্টি আর মিহি সুরে ফআব জমানোর অছিলায় ওদের দুজনকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওগো তোমরা এলে কোত্থেকে? ওগো তোমরা থাকো কোথায়? ওগো তোমরা কোনদিকপানে যাবে?’

কি আশ্চর্য! ওরা দুজনে আমার কথার কোনোরকম জবাব দেওয়া তো দূরের কথা, আমার দিকে ফিরে তাকালো না পর্যন্ত। ওদের কারু চোখের তারা একটুও নড়লো না, দুটো চোখই যেন পাথরের তৈরী, দুটো চোখেই নিথর শূন্য এক দৃষ্টি। আমার এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো ওরা যেন কোনো জ্যান্ত প্রাণী নয়, ওরা যেন কোনো শপিং মলের শো-কেসে সাজানো কাঁচের নিষ্প্রাণ পুতুল, আকাশ-ছোঁয়া দামে বিক্রি হয়ে যাবে এক্ষুনি, আর তারপরে আবার একপলকের জন্য মনে হলো, এমন নয় তো যে ওরা আছে বটে, কিন্তু আমিই আসলে নেই, আমার অস্তিস্তটুকু হঠাৎ কোনো এক মায়াবলে মুছে গেছে এই বিশ্ব চরাচ থেকে, তাই ঠিক কার কথার উত্তর দেবে ওরা, বুঝে উঠতে পারছে না সেটাই।

চটকা ভাঙলো কৃষ-এর কথায়। চোয়ালদুটো চুইংগাম চেবানোর স্টাইলে নাড়াতে নাড়াতে বললো, ‘আমার কথা শোনো, ওদেরকে কিস্যু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। ওদের কে আমিও জিজ্ঞেস করেছি বিস্তর কথা। ওরা একটারও উত্তর দেয় নি। আর উত্তর দেবে কি, উত্তর দেবার মতো অবস্থাতেই তো নেই ওরা। ভালো করে লক্ষ্য করে দ্যাখো। অ্যাকচুয়ালি দে আর আন্ডার সিভিয়ার ট্রমা।’

আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘বলো কী হে? এই কাঁচা বয়সে ট্রমা হবে কী!’ তারপর আমতা আমতা করে বললাম, ‘আর তাছাড়া এ তো তোমার আন্দাজমাত্র। এটা তো সত্যি নাও হতে পারে।’

কৃষ বললো, ‘তোমাকে বলা হয়নি, স্কুলের শেষ দুটো ক্লাসে আমার কিন্তু সাইকোলজি কম্পালসারি মেন পেপার ছিলো। মনের অন্ধি-সন্ধি তাই আমি নেহাত মন্দ বুঝি না, বুঝেছো?’ শোনো, আমি প্রায় সিওর, ওরা দুজনেই কোনো এক নারকীয় বীভৎস পরিস্থিতির শিকার। এমন কোনো ভয়ংকর ঘটনার অভিজ্ঞতা ধাক্কা মেরেছে ওদের চেতনায়, বোধে, যে সাড়া দেবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে ওদের মন। আর শরীরও হয়ে পড়েছে মূক, নীরব, নিথর। আরো কি জানো! আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওদের এই বীভৎস অভিজ্ঞতা ঘটেছে মানুষ নামের জীবগুলোর কল্যাণে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মগুলো ভেঙেচুরে একসা করে স্বেচ্ছাচার চালানোয় ওরাই সবচেয়ে ওস্তাদ কিনা। নারকীয় ঘটনা ঘটানোয় সব মানুষেরই ডক্টরেট নেওয়া আছে, বুঝেছো? আর সেইজন্যই তো বললাম না, ওদের দুজনকে নিয়ে যেতে চাইছি এমন কোথাও, যেখানে আর কিছু থাকুক না থাকুক, মানুষ নেই অন্তত!

কৃষ-এর কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ আমার মনে হলো, আচ্ছা শুধু শুধু কুমীরটা বক্তৃতামালা শুনে এভাবে আমি সময় নষ্ট করছি কেন! আর বকগুলোকেই বা হাজারো প্রশ্ন জিগিয়ে চলছি কেন মুখে ফ্যানা তুলে! ওদের সঙ্গে কথা বলার কাজটা তো আমি মনে মনেই সারতে পারি, নাকি! একটু আগেই না অক্টোপাস জেঠু আমায় ঠিক সেরকমই একটা ক্ষমতা দিয়েছে। ক্ষমতাটা সত্যিই পাওয়ারফুল, নাকি স্রেফ কথার কথা, তারও একটা পরীক্ষা এইবেলা হয়ে যাবে। আর শুধু কি মনের কথাই নাকি! ওদের পুরো স্মৃতির অ্যালবামটাই তো আমার মনের সামনে ফুটে ওঠার কথা!

এই কথাটা মনে হতে না হতেই আমি স্থির চোখে তাকালাম একটা বকের চোখের দিকে। তারপর আস্তে করে চোখদুটো বুজলাম। আর ওমা-কী ম্যাজিক! সঙ্গে সঙ্গে যে আমার মাথার মধ্যে চালু হয়ে গেলো নিরন্তর দৃশ্যের এক আশ্চর্য ফোয়ারা।

আমি দেখতে পেলাম নীল আকাশকে সাদা করে দিয়ে ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলেছে অসংখ্য বক। আর তাদের মধ্যেই রয়েছে-ঠিক চিনতে পারলাম, এই দুজনও। উড়তে উড়তে, ভাসতে ভাসতে, লাফাতে লাফাতে ওরা বসছে ধানের হলুদে, ঘাসের সবুজে, আর নদীর নীলের ঠিক ধারটায়। বসছে, আর তারপরেই উড়ে যাচ্ছে আবার। কোথাও আবার বসার পরেই উড়ে না গিয়ে, যত্ন করে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে কী যেন। আর মাঝে মাঝে কী হাসিই না হাসছে সকলে মিলে একসঙ্গে।

(এর পর আগামী সংখ্যায়)

Comments

busy

ভাস্কর রায়
About the author:
জন্ম ১৯৭৬ সালের ১৭ই অক্টোবর, কলকাতায়। পড়াশুনা ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে। লেখা লেখির শুরু অল্পবয়সেই। প্রথম ছোটোগল্প ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৯৪ সালে। এরপর ২০০৫ সালে “বাংলা লাইভের” গল্প প্রতিযোগিতায় সেরা গল্পকারের সম্মান লাভ। প্রথম প্রেম ভাই, তারপর (সিনে)মা। আর তিব্র অপছন্দ হোলো মোবাইল ফোন, কৃত্তিম ব্যবহার আর নকল সুগন্ধী।