নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ১০
লিখেছেন সত্যব্রত মজুমদার   

এর আগে
নেতাজীর হোমফ্রন্ট-৩০ এর দশকের বিস্ফোরণোত্তর বি ভি সুভাষ চন্দ্রকে-- সার্বিক নেতৃত্বে বরণ ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির পরিবেশে

১৯৩৭ সালে পড়াশোনা উপলক্ষে লেখককে ঢাকা থেকে কলকাতা চলে আসতে হয়। তখন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স এর প্রায় সব নেতা ও কর্মীরা বন্দী রয়েছেন। ১৯৩৪সনের পরেও যে অল্প কয়েকজন পুলিশের দৃষ্টির অন্তরালে থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন তারাই ঢাকা এবং তার আশপাশে সংগঠনের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিলেন। এ ব্যাপারে অন্তরীণাবদ্ধ মৃত্যুঞ্জয় রায় (বড় কাকা) এর ভূমিকা অসামান্য। এ ছাড়াও সুধীন পাল, অমলেন্দু ঘোষ, নারায়ণ চ্যাটার্জী, অমিয় সেন, অমরেন্দ্র বসু, অমলেন্দু সেন, বীরেন কর (মুকুল) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সত্যব্রত (চঞ্চল) মজুমদার ঢাকাতে এই সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত ছিল এতকাল। কলকাতা এসে তাকে নূতন করে সংগঠন গড়ার কাজে নামতে হলো। কলকাতা সংগঠনের অস্তিত্বাবশেষ কিছু থেকে থাকলেও এর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলো না। দক্ষিণ কলকাতা ও যাদবপুর ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজকে কেন্দ্র করে নূতন করে সংগঠন গড়ে তোলার কাজ সুরু হলো। কিছুদিন বাদে চঞ্চল মজুমদার স্কুলজীবনের বন্ধু নরেশ গুপ্ত (বাদল) পড়াশোনা উপলক্ষে কলকাতা চলে এলেন। দল গঠনে নরেশ বাবু চঞ্চল মজুমদারের সহযোগী হলেন। এর কিছুদিন পর ঢাকা থেকে এলেন বীরেন কর(মুকুল)। তিনি সদ্য গড়ে ওঠা দলটিকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ১৯৩৮ থেকেই বি-ভির নেতৃস্থানিয়রা এবং কর্মীরা বন্দীদশা থেকে একে একে মুক্ত হলেন। দলের অন্যতম নেতা কামাখ্যা রায়ও এ সময় মুক্ত হয়ে কলকাতায় বসবাস সুরু করলেন। তিনি কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বালিগঞ্জে মেস করে সেখানে থেকে অর্থ উপার্জনে মন দিলেন। তিনি বাহ্যত দলের কাজকর্ম থেকে সরে গেলেন কিন্তু গোপনে কলকাতার গুপ্ত সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। ১৯৩৮ সনে কামাখ্যা রায গুপ্ত সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকেই চঞ্চল মজুমদার হাঁর সঙ্গে সামির হয়ে গেল। তাঁর সঙ্গে এই যোগাযোগ রক্শিত হয় ভারতের রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর কাল পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। একটানা দীর্ঘ আট বৎসরের অধিক কাল কামাখ্যা রায়ের নির্দেশে গুপ্ত সংগঠনের কাজ পরিচালিত হয়। এই সময়কালের পরিসরে তাঁর বহু কাজের সঙ্গে চঞ্চল মজুমদার সরাসরি যুক্ত ছিলেন। যে সব কাজের সঙ্গে তাকে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকতে হয়েছে সুগলি ছাড়াও তাঁর নিকট সান্নিধ্যে থাকায় চঞ্চল মজুমদার অন্যান্য আরো অনেক কাজ সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল হয়েছিল। পরবর্তীকালে কামাখ্যা রায়ের সঙ্গে তাঁর কৃত এবং জ্ঞাত কাজকর্ম সম্বন্ধে চঞ্চল মজুমদারের বিস্তারিত আলোচনা হয়। বি-ভির ইতিহাস সঙ্কলনের প্রয়োজনে এসব তথ্যসতূহ অবশ্যই প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন । ১৯৩৪ সন পূর্ব-ঘটনায় তথ্যাদি থেকে সুরু করে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত যে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে সেগুলো যথাসম্ভব এই নিবন্ধে অন্তর্বুক্ত করা হয়েছে। পুর্দোক্ত নিবন্ধে বলা হয়েছে-বি-ভি নেতাজীকে দলের সার্বিক নেতৃত্বে বরণ করে নেয়্ - এই তথ্যটির একটু বিষদ করে বলার প্রয়োজন তথ্যগতভাবে সত্যকে প্রকাশিত করার জন্য। এটা সুবিদিত সত্য যে সুভাষচন্দ্র-দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে নেতৃত্বে নরণ করে নিয়েছিলেন বিশের দশকের সুরুতে। সে সময় থেকই সুভাষচন্দ্র বি-ভি ও সত্যরঞ্জন বক্সীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন। বিশের দশকের অন্তে এবং ত্রিশের দশকের সুরুতে সুভাষচন্দ্র বি-ভির বৈপ্লবিক কাজকর্মে নীতি নির্ধারণে দলের অন্যতম প্রধান নেতা সত্যরঞ্জন বক্সীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। ত্রিশের দশকের প্রথমার্ধে বি-ভির বৈপ্লবিক বিষ্ফোরণ ভিত্তিক কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে বি-ভি সুভাষচন্দ্রের নির্ভরযোগ্য সংগঠনে পরিণত হয়।

১৯২৯-৩০ সরালের পরিসরে সুভাষচন্দ্র বি-ভির মূল নেতৃত্বের সঙ্গে যে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন তা জানা যায় মেজর সত্যগুপ্ত, রসময় শূর, ভূপেন রক্ষিত রায় এবং সুপতি রায়ের ১৯৬১ সালের মৌখিক বিবৃতি থেকে। সে সবের লিপিকার উজ্জ্বলা রক্ষিত রায়্ বিবৃতিগুলি তাঁর মৃত্যর পূর্বে চঞ্চল মজুমদারকে দিয়ে যান।
“1930: Alipore Jail এ অনেকেই থাকাতে আবার বাইরে Barda, Bhupenda, ইত্যাদি থাকাতে একটা Co-ordinated action এর plan করতে লাগলেন Subhas Bose।
“সত্যাগ্রহের ব্যাপারে নিশ্চই সরকার অত্যন্ত অত্যাচারী হয়ে উঠবে আর তার বিরুদ্ধে আমরা spotting করতে পারব এবং সেই plague spot গুলিকে একে একে root out করতে পারলে অস্ত্রও কম লাগবে আর effect ও প্রচুর হবে।
“Subhas বাবুর মতে অস্ত্র না থাকলে ছুরি ছোরা ব্যবহার করতেও কুন্ঠা নাই। Gordon, Tegart প্রভৃতি যার ওপরেই হোক আক্রমণ শুরু করা উচিৎ।
“Simpson-High Court-Ranken Roxbourgh-James Padie Subhas Babu Roxbourgh সম্বন্ধে Softness- আমাদের দিক থেকে কোন Softness নেই। টাকার অন্যন্ত অভাববোধ-- Benoy Bose তখন কলকাতায় এসেছেন। তার সাথে connection দরকার। Satyada নিজেই অত্যন্ত desperate কিন্তু Subhas বাবু বলেন সত্যদাকে তার আরো অনেক দরকারি কাজে লাগবে”।
ভূপেন রক্ষিত রায়ের বিবৃতি থেকে আমরা জানতে পারিঃ
“Subhas বাবুর সাথে কোন policy নিয়ে আলোচনা করে কোনbearing নেই। তবে কোন action এর কথা তাকে জানান হোত এবং তার approval পাওয়া যেত। Subhas বাবুর meteoric rise-- আর তার সাথে synchronous হল আমাদের rise”. রসময় শূরের বিবৃতি থেকে এ সম্বন্ধে জানা যায়ঃ
“Sarat Bose এর chamber এ বসে বা Liberty Office, Satya Bakshi, Rasamoy Da, Satya Gupta ইত্যাদি প্রথম পরামর্শ করে যে Round Table এর সময় একটা ভালমত grand demonstration দেওয়া। তখন ৭/৮টা revolver আমাদের হাতে। যাই হোক সেটা fail করল। Next ঠিক হলো Writers Building, High Court আর Roxbourghর ওপর যুগপৎ একই দিনে আক্রমণ করা হবে-- atleast তখন Writers Building to begin with Simson-- দুই জন High court—to begin with Rankin ১ জন-- Roxbourgh.

Satyada নিজে যাবার জন্য ব্যস্ত ছিলেন কিন্তু Subhas বাবু তাকে সম্পূর্ণ মানা করলেন।
“Liberty Office এ Kiran Sankar Roy, Satyada কে বল্লেন যে camouflage এর জন্য Satya Guptaকে B.P.C.C secy. করার জন্য--সেই সময় Purna Das secy. ছিলেন এবং জেল থেকে বেরিয়ে এলেন। Subhas বাবুর সাথে ঠিক action এর আরো কথাবার্তায় তিনি খুশী হলেন। “Then Benoy takes the lead” বল্লেন Subhas Babu।
শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো একটা actionই হবে এবং Writers Buildingই লক্ষ্য”।
“Subhas বাবু Paddie ওপর আক্রমণ করার জন্য বিশেষ Urge করেন। কিন্তু তাকে বলা হোল যে Simpson প্রথম Victim তার পর Paddie নিশ্চয়ই”।
সুপতি রায়ের বিবৃতি থেকে জানা যায়ঃ
‘কোলকাতা এসে প্রথম দিনেই Satya Bakshi র সাথে contact করা গেলনা। Satyada পরের দিন খবর পাওয়া মাত্রই বেশ কিছু টাকা পাঠিয়ে দিলেন’।
সত্যদা (সত্য বক্সী)র সাথে দেখা হলো। তিনি Benoyকে বাইরে পাঠানর কথা বললেন (এটা নাকি নেতাজী এবং Sarat Bose এর suggestion)। আমার তাতে কোন সাড়া নাই। টাকা পয়সা এবং arms এর বিষয়ে খুবই press করলেন। বেশ কিছু টাকা Satyada সঙ্গে সঙ্গেই দিলেন’।
‘আর একটা দিক সত্যদা (বক্সী) -- সুভাষবাবু শরৎ বোস যাদের অসীম উৎসাহ।
Next problem-- অর্থ। Satyada প্রথম দিকে বেশ টাকা দিতে পেরেছেন’।
‘Satya দার (Bakshi) সাথে সে সময় বেশ contact ছিল এবং তিনি যথেষ্ট টাকা দিতেন। কিন্তু তখন অর্থের প্রয়োজন তার থেকেও বেশী তাই মোটামুটি want কোনো দিনই যাচ্ছে না’।
“Satya দার (Bakshi) সাথে Supatida’র কথাবার্তা--- এইভাবে কি করে চলবে।...
“এদিকে Satyada (Bakshi) কোন action এর জন্য বড়ই ব্যগ্র। তিনি তো ভেতরের খবর জানেন না। তাই arms নেই শুনে তিনি তো অবাক। এদিকে তিনি কাউকে কাউকে কথা দিয়েছেন তাই আরো বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
“Supatida সেই সকালে সত্যদাকে (Bakshi) খবর দিয়ে এলেন যে সে দিনই action হবে। তিনি আবার তাঁর Shelterএ ফিরে এলেন। সকাল বেলা Dinesh আর বাদল দুজনেই Park Street থেকে তৈরী হয়ে এল।...”

১৯৩০ এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে বি-ভির প্রকাশ্য ও গুপ্ত আন্দোলনে সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিসরে বি-ভি সুভাষচন্দ্রকেই এই সার্বিক নেতৃত্বের আসনে কেন অধিষ্ঠিত করে তা বি-ভির অন্যতম প্রধান নেতা সত্যরঞ্জন বক্সী মহাশয় খোলাখুলি আলোচনা করেন তাঁর লেখা “কেন নেতাজী” প্রবন্ধটিতে। প্রবন্ধটি ১৯৬৮ সালে নেতাজীর জস্মদিনে ‘বসুমতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বিষয়টাকে সহজ ও বোধগম্য করার জন্য এখানে অংশবিশেষ তুলে দেও হলো। তিনি লিখেছেন--“ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ‘নেতাজী’ কেন? এখন থেকে চল্লিশ বৎসর পূর্বে বাংলার কয়েকজন বিশিষ্ট কর্মী বিপ্লবী দলের নেতা ও নেতৃস্থানীয় এই প্রশ্নই তুলেছিলেন। নেতাজী তখন সবেমাত্র মান্দালয় বন্দীশালা হতে ফিরে এসে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। আমি কোন বিপ্লবী দলভুক্ত-এরা সকলেই জানতেন। আমি সর্বাবস্থায় ছায়ার মত নেতাজীকে অনুসরণ করি। ১৯২১ হতে শুরু করে দেশ বিভাগের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বিপ্লবী দলগুলি (অনুশীলন, যুগান্তর কি অন্য বিপ্লবী গোষ্ঠী) বাংলা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। তাঁদের ভোটেই কংগ্রেস নেতা নির্বাচন কি কমিটিগুলি গঠন করেছে।

“বিপ্লবী বন্ধুদের বক্তব্যঃ সুভাষচন্দ্র বিপ্লবী গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত নন। আমরা কেন বিপ্লবিদলের সভ্যকে বরণ না করে সুভাষচন্দ্র বসুকে নেতারূপে বরণ করে নিলাম। মনে আছে আমি জবাব দিয়েছিলাম-- অবশ্য ভোটাধিক্যে আমরা কোন রাম শ্যাম কি যদু কে কংগ্রেসের সভাপতি পদে অভিষিক্ত করতে পারতাম। ভোটের বাইরে দেশ আছে। দেশ কি রাম কিংবা যদুকে গ্রহণ করত? De-Velera, Sanyet Sen বিপ্লবী দলের নেতা - অথচ তাঁরাই দেশেরও নেতা। আমাদের কোন বিপ্লবী নেতা সত্যই দেশের গ্রহণযোগ্য নেতা হিসাবে উত্তরণ করলে প্রশ্নটি অন্যরূপে নিতে পারত। শুধু ভোটে নেতা হয় না। প্রশ্ন এল কিসে হয়? হয় ব্যক্তিত্যে, শিক্ষায়, চরিত্রে, চরিত্রগত আভিজাত্যে, সাধনায়, অনুষ্ঠানে। ইতিহাসের একটা দিক আছে--যা সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বোঝা শক্ত-- “imponderable” of History। সহস্র সোপান বেয়ে বুকের পাঁজরে আলোক শিখা বহন করে সুউচ্চে দাঁড়িয়ে ‘নেতাজী’-জগতের বিষ্ময়, ভারত ইতিহাসের মহাপুরুষ--মূর্তবানী”।

(এর পর আগামী সংখ্যায়)


নেতাজীর হোমফ্রন্ট বাংলা ১৪০৪ সালের আশ্বিন মাসে পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। লেখকের অনুমতিক্রমে মুখোমুখি.কম, ইন্টারনেট পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে এই পুস্তকটি পুনঃপ্রকাশ করা হচ্ছে।

Comments

busy

সত্যব্রত মজুমদার
About the author: