Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
জৈব প্রিন্ট কর ইমেল
আর্টিকেল সূচি
জৈব
পাতা 2
পাতা 3
পাতা 4
পাতা 5

বিলম্বিত

সুবোধ খানিক আগে থেকেই গাড়ির এসি মেশিন চালিয়ে ভেতরটা ঠান্ডা করে রাখে। অফিস থেকে বেরোবার সময়ের কোন ঠিক নেই বিনায়কের। তবু যে রোজ সুবোধ কি করে ঠিক সময় কাজটা করে! ফাইল আর ল্যাপটপ নিয়ে এখন এগিয়ে গেল। গাড়ির কাছে পৌঁছবার আগেই পেছনের দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে। মাথাটা একটু হেলিয়ে আজ দরাজ হাসি উপহার দিলেন বিনায়ক। তারপর আয়েসে শরীর ছেড়ে দিয়ে বসলেন। আঃ। দীর্ঘ সাত বছরের লড়াই।

বুকপকেটেই আছে চিঠিটা। বন্ধ খাম। এখনটও খোলেননি। নন্দিনীকে খুলতে বলবেন। নন্দিনী অবশ্য এসব নিয়ে তেমন চাপে থাকেন না। বরং মিসেস গান্ধী বা মিসেস শর্মার সঙ্গে দেখা হলেই যে তাঁরা স্বামীদের অফিস-প্রোমোশন-বিদেশ ট্যুরের গল্প করেন, সে নিয়ে বিনায়কের সঙ্গে গোপনে হাসিঠাট্টা করেন। মিসেস বাসু তো আরও এককাঠি বাড়া। এই তো কদিন আগেই নন্দিনী বলছিলেন, ‘পার্টিতে মিসেস নায়েকের সঙ্গে কেমন আঠার মত লেগে থাকেন মিসেস বাসু, দেখেছ? আমি ভাবি, না জানি কি গল্প করেন। ওমা শুনি, বলছেন নায়েক সাহেবের বিজনেস ট্যুর বেশ ভালো হল এবার, না? পঁচিশ কোটির অর্ডারটা পেয়েছেন!’ খুব হেসেছিলেন দুজনেই। নায়েক আর বাসু হয়ত জানেনই না, তাঁদের অর্ধাঙ্গিনীদের আড্ডাতেও অফিসের অর্ডার-পার্টি-সাপ্লায়ার-বিজনেস ডীল কেমন মিশে থাকে। মিসেস বাসু নন্দিনীকেও বলেছেন একদিন, ‘আপনার আলাদা চাকরি আবার মিস্টার মুখার্জির চাকরির টেনশন। কি করে সামলান সব? এই তো অফিসে সাব-স্টাফ রিক্রুটমেন্ট নিয়ে কদিন রাতের ঘুম নেই আমার।’

বাইরের কেউ শুনলে মনে করবে, মিসেস বাসুই কাজটার দায়িত্বে ছিলেন বুঝি। সুবিমল বাসুর কাজের দায়িত্ব এইভাবেই ভাগ করে নেন মিসেস দীপা বাসু।

চক্রবর্তী বলছিলেন একদিন। ‘বুঝলেন মুখার্জি, বাড়িটা ফার্নেস হয়ে আছে। এবারেও যদি চিফ ম্যানেজারের প্রোমোশনটা না পাই, বউয়ের কাছে প্রেস্টিজ থাকবে না। এক এক সময় বলতে ইচ্ছে করে, বেশ তো আরামে সারাদিন খাচ্ছ-দাচ্ছ-চেড়াচ্ছ, দুপুরে বিউটি স্লিপ বিকেলে জিম সন্ধেবেলা পার্টি উইকেন্ডে ক্লাব, আর কত চাও বাবা? সংসারে অশান্তির ভয়ে বলতে পারি না। পুরুষমানুষদের দুঃখ কেউ বোঝে না। অমুক কি করে তোমার পরে জয়েন করে আগে প্রোমোশন পেল, তমুক কি করে কোম্পানির গাড়ি পেল, ক-বাবুকে অফিস ল্যাপটপ মোবাইল ফোন সব দিল, গ-বাবু প্রতিমাসে ট্যুরে যাচ্ছে, তুমি কেন পাও না? মাথা গরম হয়ে যায়, জানেন?’

না, বিনায়ক সত্যিই ভাগ্যবান। নন্দিনী কোনদিন বলেন না এমন। বরং অফিস নিয়ে চাপের সময় নন্দিনীর একটা কথা, ‘জীবনের জন্যেই জীবিকা, জীবিকার জন্যে জীবন নয়’, খুব শক্তি দে বিনায়ককে। তবু চাকরি করতে এসে ত্যাগী সন্ন্যাসী হয়ে থাকা কি হয়? নিজের প্রাপ্য সম্মানটুকুর লড়াই ছেড়ে দিলে হয়? ম্যানেজমেন্টের পড়ায় সেই ম্যাসল’জ হায়ারার্কি নীড খুব মনে ধরেছিল। একটা পিরামিড। আব্রাহাম ম্যাসল-র হায়ারার্কি মডেল। প্রয়োজনের শ্রেণি বিভাগের সূত্র। একটা পিরামিড, তাতে পরপর পাঁচ ধাপ। সবচেয়ে নিচের ধাপে- ‘সার্ভাইভাল’, বেঁচে থাকার জন্যে অবশ্য প্রয়োজনীয় চাহিদা। খাদ্য বস্ত্র শারীরিক সব চাহিদা। এই নিতান্ত জৈব ব্যাপারগুলো না মিটলে পরের ধাপে পৌঁছনো হয় না। দুই, ‘সেফটি’, সুরক্ষা। মাথার ওপর ছাদ। আশ্রয় মানুষের পরের চাহিদা। তিন, ‘সোশাল’, সামাজিক অবস্থান। যে মুহুর্তে প্রথম দুটি চাহিদা পূরণ হয়, সামাজিক অবস্থানের এবং সামাজিক স্বীর্কতির প্রয়োজন অনুভব করে মানুষ। স্বজনবন্ধুর সঙ্গে, প্রতিবেশীর সঙ্গে মিলেমিশেই মানুষ ভালো থাকে। একা একা কেউ ভালো থাকে না। চার, ‘এস্টিম’, শ্রদ্ধা। এই পর্বের চাহিদা খুব গভীর এবং সুক্ষ্ম অভাববোধের কথা। আশেপাশের মানুষের শ্রদ্ধা, আত্মসম্মানবোধের তীব্রতা। স্বীকৃতি চাই-ই চাই। বিনায়কের এই প্রোমোশনটা তাই একটা প্রয়োজন। হায়ারার্কি নীডের নিয়ম মেনেই। এই চাহিদার তীব্রতায় অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন ল্যাপটপ আর কাজ নিয়ে। পরিশ্রমের স্বীকৃতি, মেধার স্বীকৃতি চাই। খুব লড়াই। জীবনের সর্বক্ষত্রেই তাই। সেই নিয়মেই তাই এক একটা প্রমোশন প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায় এক সময়। কাজের স্বীকৃতি চাই না? সবচেয়ে ওপরের ধাপে ‘সেল্ফ-অ্যাকচুয়ালাইজেশন’, মোক্ষ। নন্দিনী বলেন, যেহেতু নিচের চারধাপ পার না হয়ে মোক্ষলাভের কথা নেই, তাই কেরিয়ারের সিঁড়িটায় বড্ড চড়াই। বিনায়ক তা মনে করেন না। লড়াইটা আছে বলেই তো জীবনের তাপ টেপ পাওয়া যায়!



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন