Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ২ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ভাস্কর রায়   
আর্টিকেল সূচি
বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ২
পাতা 2
পাতা 3

দুই
এর আগে

মায়ের সব কথাই তো ভুষিমাল বলে আমি উড়িয়ে দিই, এবারে শুধু একটা শব্দে আমার কানে খটকা লাগলো। আমি বললাম, ‘মড়কের সিজন মানে? ওটা তুমি কী বললে মাম?(মা-কে আমি আদর করে কখনো কখনো মাম আর কখনো মাম্ব বলে ডাকি)। এরকম কোনো সিজনের কথা তো আগে কখনো তুমি বলো নি আমায়? কী হয় এই সিজনে, বলবে না আমায়? কেন তোমার মুখটা এই কথায় এমন পাংশু দেখাচ্ছে মাম?’

আমার মা আস্তে আস্তে আমার মাথায় নিজের গালটা ছুঁইয়ে বললো, ‘সোনা আমার, মানিক আমার, বুচান আমার(মাম আমায় এই বলেই সবসময় আদর করে থাকে)। প্রত্যেক বছর এই মড়কের সিজন আসে ঠিক দু মাসের জন্য। গতবছর এই সিজন যখন এসেছিলো, তখনো তো তুই আমাদের কোলে আসিস নি রে সোনা। তাই তোকে এর আগে এটা নিয়ে কিছু বলাও হয় নি।’তারপর মাম-মাম (এটাও মামের আরেকটা নাম)খুব আস্তে আস্তে বললো, ‘আজ যে রংচঙে রাংতাটা খেয়ে ফেলে তোর অ্যাতো ভোগান্তি, সত্যি বলতে কি, সেটা দেখেই ফের মনে পড়লো যে বছর ঘুরে গেছে, এসে গেছে আরেকটা মড়কের সিজন। তবে এতো স-বে শুরু। এবার দিন-দিন দেখবি অবস্থা আরো কী ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়।’

আমি আরো ঘন হয়ে সেঁটে গেলাম মায়ের কাছে। মা যেন বা জমিয়ে বলছে শীতের রাতে কম্বল-মুড়ি দেওয়া এক রহস্যকাহিনী! ফিসফিস করে শুধোলাম আমি, ‘কই তুমি তো আমায় বাকিটা খুলে বললে না মাম্ব? কী করে, কেন কী ভাবে এই সিজন শুরু হয়, কীভাবে বাঁচবো আমরা এর থেকে, তুমি সে সব বলবে না আমায়?’

এই কথায় কিছুক্ষণ আমার দিকে স্থির চোখে চেয়ে থেকে তারপর একটু চোখ পিটপিট করলো আমার মা। তারপর বললো, ‘আগে আমায় বল, মানুষ কাকে বলে, তুই জানিস কি? আচ্ছা, তার আগে বল, ডাঙা কাকে বলে?’

আমি বললাম, ‘না মাম। এর কোনটাই আমি জানি না গো।’মা একটু অসহিষ্ণু স্বরে বললো, ‘এইজন্যেই তোকে পইপই করে বলেছিলুম স্কুলে যেতে। স্কুলে গেলে এগুলো আর আমায় শেখাতে হতো না, নিজেই দিব্যি জানতে পারতিস। যাক গে, শোন্, এই যে আমাদের জলের দুনিয়া, এই জলের দুনিয়া শেষ হলে শুরু জল-না-থাকার দুনিয়া। তাকেই বলে ডাঙা। আর সেই জল-না-থাকার দুনিয়ায় কিলবিল করে হেঁট চলে বেড়ায় ভারি অদ্ভূত আকৃতির এক রকমের জন্তু। তাদেরই বলে মানুষ।’ তারপর মা একটু কেমন যেন ছলো-ছলো চোখেই বললো, ‘আমরা আজ পর্যন্ত কখনো কোনো অপকার করি নি মানুষদের। কিন্তু মানুষদের কথা তোকে কী বলবো জানি না, ওরা আমাদের ভালোর কথা একটুও ভাবে না। যেখানে আমরা থাকি, সেই নদী আর সেই সাগরে ডাঁই করে এনে ফেলে রাশি রাশি আবর্জনা। বিষাক্ত সব তরল আর কঠিন পদার্থ অকাতরে তারা ঢেলে দেয় নদীতে, তাতে আমরা মরলুম না বাঁচলুম, তা ভাবতে তাদের ভারি বয়েই গেলো।’

আমি বললাম, ‘যে রাংতাটা আমি গিলে ফেলেছিলাম সেটা বুঝি সে রকমই কিছু একটা ছিলো?’ আমার মা এইসময় হঠাৎ করে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো, ‘ওরে আমার সোনা রে, ওরে আমার বুচান রে!’ হেভি আবেগ উঠে গেলে তবেই মা-কে ঘনঘন এমনটা করতে দেখেছি। এরপর ঈষৎ চুপ করে থেকে বললো, ‘হ্যাঁ, অনেকটা তাই-ই বটে। তবে কি জানিস, এমনিতে তো বছরের বারোটা মাস ধরেই নিজেদের দুনিয়ায় যাবতীয় জঞ্জাল ওরা এনে ফ্যালে এই নদীটায়, কিন্তু ...তুই যে রাংতাটা গিলে ফেলেছিলি, কিম্বা ওই যে মড়কের সিজন-এর কথা বলছিলাম না, এসবের আড়ালে রয়েছে পুরো একটা অন্য গল্প।’
‘কী গল্প, বলেই ফ্যালো না বাবা। এত ভ্যান্তাড়া করছো কেন?’ বলি আমি।
মা বললো, ‘সেটা শোনানোর আগে আরো দুটো কথা বলে নিই, শোন। মানুষের ফেলা জঞ্জালের হাত থেকে বাঁচার জন্যই প্রাণের তাগিদে আদিমৎ স্য প্ল্যাঙ্কটন বানিয়েছিলেন তাঁর প্রথম ল’-টা। সবসময় মাঝনদীতে থাকবে, নদীর পাড়ের দিকে পারতপক্ষে যাবে না। মানুষদের বর্জ্য বেশিরভাগই এসে জমা হয় নদীর পাড়ের দিকটাতেই কিনা, তাই এই ল’-টা মেনে চললে, কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে-বততে থাকতে পারি মাঝনদীটুকুতে।’
‘তাহলে আর ভাবনা কীসের, মাম?’ শুধোলাম আমি। আর তারপরই জুড়ে দিলাম, ‘এই তো, এই যে আমায় বুঝিয়ে বলে দিলে তুমি, দেখে নিও, এবার থেকে মাঝনদীতেই থাকবো সর্বক্ষণ, পাড়ের দিকে আর কক্ষণো যাবো না। শুধু আমিই না, ঝিলমিলকেও পাড়ের দিকে যেতে দেবো না কক্ষণো।’

এই কথাটা শুনে বড়সড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আমার মামণি। তারপর বললো, ‘ওরে, প্ল্যাঙ্কটন এই ল’ বানিয়েছিলেন কয়েক হাজার বছর আগে রে। কয়েক হাজার বছর পরে আজ মানুষের পাগলামি যে ঠিক কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছতে পারে, তা কি উনি কল্পনা করে উঠতে পেরেছিলেন নাকি আদৌ? তাই আমাদের শুধু এটুকুই বলেছিলেন যে, নদীর পাড়ের দিকে যেও না। ভাবতেই পারেন নি যে, এমন সময়ও কখনো আসতে পারে, যখন মাঝনদীটুকুও একই রকম ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে।’



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন