Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ১ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন ভাস্কর রায়   
আর্টিকেল সূচি
বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ১
পাতা 2
পাতা 3

এক

মা আমায় পইপই করে বারণ করে দিয়েছিলো এর আগেই। ‘বুচান, বারবার করে আগেও বলেছি, আবারও বলছি, মুখের সামনে যা পাবে, তাতেই মুখে দিয়ে বসবে না মোটে। কতবার বোঝাবো তোমায়, এতে ভীষণ রকম ফুড পয়জনিং হয়ে যাবার চান্স থাকে। পেটের গন্ডগোল একবার শুরু হয়ে গেলে, আজকাল চারপাশের জলের যা অবস্থা, তোমাকে সারিয়ে তুলতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে আমার। বুচান, কোন কিছুতে মুখ দেবার আগে, অন্তত দশবার ভাববে। আমি যা এনে দেবো, তাছাড়া আর যদি কিছু মুখেই না দাও, তাহলেই সবচেয়ে বেটার। আর ফাস্টফুড তো এক্কেবারে নো-নো।’

মায়ের এইসব জ্ঞানগভ্যি বাক্যি আমি চোখ পিটপিটিয়ে শুনেছিলাম ঠিকই, কিন্তু তোমরাই বলো, আমার টাইপের বদমাইশ বাচ্ছার পক্ষে কি মায়েদের এতরকম শাসন মেনে চলা আদৌ সম্ভব? তাই যা হবার, তাই কিন্তু হয়েছিল। ডান কান দিয়ে মায়ের কথাগুলো শুনে, বাঁ কান দিয়ে তুরন্ত সেগুলো বের করে দিয়ে আমি সটান ডুব মেরেছিলাম মস্তিতে। আরে মা তো স্রেফ সকালবেলায় একবার হাঁক পেড়েই খালাস, তারপর বাকিটা দিন আমাকে চোখে চোখে রাখার সাধ্যি আছে নাকি তার। তাকেও তো হর রোজ দিনের খাবারের জন্য মাইলকে মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়, নাকি। আর সেইসময়টুকুতেই না আমার এটা-সেটা খেয়ে পেট ভরানোর অখন্ড অবসর। তাই বলে তোমরা আবার ভেবে বোসো না যেন, যে এসব অপকর্ম আমি একলা করি। আমার বান্ধবি ঝিলমিল, আমাদের বাড়ির খুব কাছেই থাকে, তাকেও ডেকে নিই এইসময়। ও-ও দেখছি খুব আমার তালে তাল মেলাচ্ছে আজকাল (কে জানে আমার প্রেমে-ট্রেমে পড়ে গেল কিনা)। প্রবলেম হলো, ওর মায়ের আমার মায়ের মতো সেই একই টেনডেন্সি, ঝিলমিলকে সভ্য করে তোলবার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টার কমতি নেই কোনো। ঝিলমিলের মা তো ঝিলমিলকে স্কুলে অব্দি ভর্তি করে দিয়েছিলো, ভাগ্যিস সেসময় আমি ছিলাম, ঝিলমিলকে স্কুল কেটে ডুবসাঁতার দেবার গোপন কায়দাটা না হলে কে শেখাত? সেই থেকে, স্কুলের দিদিমণির নজর এড়িয়ে, সারাটা দুপুর ঝিলমিল থাকে শুধু আমারই সাথী হয়ে।

Image

শুধু ঝিলমিলের মা-ই নয়, আমার মা-ও অবিশ্যি আমায় স্কুলে ভর্তির কম চেষ্টা করে নি। একদিন রাত্রিবেলায় ছলো-ছলো চোখে তো রীতিমতো বক্তৃতাই দিয়ে বসলো, ‘বুচান, স্কুলে না গেলে তুমি কি ভীষণ ঠকবে, তা কিন্তু তুমি কল্পনাও করতে পারছো না। দেখো বুচান, নদীর গর্ভে, একটা পাথরের এককোণায় তোমার জন্য। স্কুলে না গেলে কী করে জানবে, এই নদীর আসল পরিচয়, কী করে জানবে নদী গিয়ে কী করে মিশে যায় সাগরে, সাগরের নুন-জলের সঙ্গে নদীর মিষ্টি জলের ফারাক কী কী, সাগরে কোথায় কী পাওয়া যায়, নদীকে ভালবাসার গোপন তরিকা কী কী! আর সবচেয়ে দরকারি যে জিনিষটা শেখার, সেটা হলো নদী কিম্বা সাগরের তলায় তোমার সম্ভাব্য শত্রু কোথায় কোথায় লুকিয়ে থাকতে পারে! বুচান, আমরা যখন তোমাদের মতো ছোট ছিলো, সে সময় আমরা কিন্তু বড়দের কথা শুনে স্কুলে গেছি রেগুলার। তোমার মতো অভব্যতা করার কথা কল্পনাতেও কেউ মনে আনি নি। আর তুমি আমাদের ছেলে হয়ে কিনা, স্কুলে যাবার সুযোগ, শিক্ষিত হবার সুযোগ হেলায় হারাবে।’

আমি তবু মায়ের কথা শুনি নি। শুনি নি, কারণ ওইরকম একরাশ নিয়মে নিজেকে বেঁধে ফেলতে যে বড্ড বিরক্তি লাগে আমার। তার বদলে বাবা আমার এইরকম জীবনই বরং ঠিক আছে । নিরন্তর জলস্রোত আর জলস্রোত। মাঝে মাঝে অযত-নিযুত নাম-না-জানা মাছের ভীড়ে হঠাৎ গোঁত্তা মেরে ঢুকে গিয়ে তাদের মিছিলটাকে বেসামাল করে দেওয়া। নদীর তলায় অ-শেষ জলজ গুল্ম আর মিষ্টি মিষ্টি শামুক-ঝিনুক-কাঁকড়া-চিংড়ি-অক্টোপাসের সঙ্গে খেলা। আর মাঝে মাঝেই পাখনা নেড়ে প্রিয় বন্ধু ঝিলমিলের পাখনাদুটো ছোঁওয়া। সেই মুহুর্তগুলোয় আমার, কী ভালোই যে লাগে।



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন