Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ৬ প্রিন্ট কর ইমেল
আর্টিকেল সূচি
নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ৬
পাতা 2
পাতা 3

এর আগে

এরকম কঠিন পরিকল্পনাকে রূপায়িত করতে অজস্র অর্থের প্রয়োজন। মন্ত্রগুপ্তির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী দলের কর্মীরা কোন এ্যাকশানের খবর পেত না কিন্তু দল যখন বিষ্ফোরণের পর বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে যাচ্ছে তখন তারা সম্ভাব্য এ্যাকশানের জন্য সর্বদাই প্রস্তুত ছিল এবং একারণেই সর্বদাই অর্থ সংগ্রহে প্রয়াসী ছিল। কর্মীদের ব্যক্তিগত দান ও সংগ্রহের মাধ্যম ছিল সে সময় বি-ভির দলের অর্থসংগ্রহের প্রধানতম পন্থা; বি-ভি সে সময় বলপূর্বক অর্থ সংগ্রহের ঝুঁকি নিয়ে অবাঞ্ছিত বিপদ ও বিপর্যয়ের সম্মখীন হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল না। কিন্তু বার্জ নিধন পর্বের পর আর কোন এ্যাকশানকে রূপ দিতে হলে তৎকালীন কঠোরতম পরিস্থিতিতে অপরিমিত অর্থের প্রয়োজন। কামাখ্যা রায়ের কাছে পরিমল চ্যাটার্জীর মাধ্যমে বলপূর্বক অর্থসংগ্রহের প্রস্তাব আসে। তিনি এ প্রস্তাবের বিরোধী হলেও শেষ পর্যন্ত দুইটি শর্তে এ প্রস্তাব অনুমোদন করেন। প্রথম শর্ত শহর অঞ্চলে বলপূর্বক অর্থসংগ্রহের কোন প্রচেষ্টা চলবে না; দ্বিতীয়ত বিনা বাধায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ধরা পড়া চলবে না।

১৯৩৪ সালের ১০ই এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের দেওভোগ গ্রামে পুলিশের সঙ্গে যুক্ত ভিলেজ গার্ডদের বি-ভি কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। গুলিতে ভিলেজ গার্ডদের একজন হত ও দুই জন আহত হয়। সুকুমার ঘোষ (লাল্টু) ও মধু ব্যানার্জী ঘটনা স্থল থেকে পালিয়ে যেতে পারলেও মতি মল্লিক ধরা পড়ে গেলেন। গভীর অন্ধকারে সুকুমার ঘোষ ও মধু ব্যানার্জী মতি মল্লিকের সন্ধান না পেয়ে মনে করলেন মতি মল্লিক পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এ ধারণা নিয়ে ওরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে জানা যায় যে মতি মল্লিক পালাবার সময় রাতের অন্ধকারে একটি খালে পরে গেলে ভিলেজ গার্ডরা তাঁকে ধরে ফেলে। বিচার প্রহসনের পর মতি মল্লিককে ফাঁসী দেওয়া হলো। এ বিপর্যয়ে দল মতি মল্লিকের মত একজন কর্মীকে হারাল আর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে সচকিত করে দিল। ফলে এ্যাকশানের প্রস্তুতির কাজ আরো অনেক সংগোপনে ও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত করতে হলো আগাম এ্যাকশানের ব্যয় নির্বাহের জন্য দলকর্মীদের দান ও তাঁদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় সংগৃহিত অর্থের উপরই নির্ভর করতে হলো। দুটি এ্যাকশানের ব্যবধান মাত্র মাসখানেকের। ১৯৩৪ সনের ৮ই মি, দার্জিলিং এর লেবং ঘোড়াদৌড়ের মাঠে পরিকল্পিত এ্যাকশান সংঘটিত হলো। বিপ্লবীরা অঘটন ঘটাল ইংরেজের দুর্ভেদ্য রক্ষাব্যূহ ভেদ করে, নিরাজত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে দিয়ে। ভবানী ভট্টাচার্য ও রবি ব্যানার্জী লেবং এর ঘোড়দৌড়ের মাঠে গভর্নর স্যার জন এন্ডারসনের অত্যন্ত সন্নিকটে উপস্থিত হয়ে বিপ্লবী বাংলার চরম দন্ড দিতে সচেষ্ট হলেন। কিন্তু সেকালে বিপ্লবীদের এ্যাকশানের ফলাফল অনেকটাই ছিল ভাগ্যের উপর অনেকটাই ছিল ভাগ্যের উপর নির্ভরশীল। এ্যাকশানে যে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হওয়ার বহু পূর্বে-হয়তো বা দীর্ঘকাল পূর্বে। সংগ্রহ কাল থেকে ব্যবহার কাল পর্যন্ত ওগুলোকে সংগোপনে নিরাপদ আশ্রমে সংরক্ষিত রাখতে হয়েছে। ফলে কার্তুজ অনেক সময় অকেজো হয়ে যেতো। এ কারণে কার্তুজ আগুনে সেঁকে নিয়ে কাজে লাগানো হতো। গরম করা সত্বেও ঝুঁকি থাকতই--ফলে তার ব্যবহারের কৃতকার্যতা অনেকটাই অনিশ্চিয়তা ছিল। এন্ডারসন সাহেবের দেহরক্ষী ভবানী ও রবিকে ধরে ফেলার পূর্বে ভবানী যে দুটি গুলি করতে পেরেছিলেন তাতে গভর্নরের শরীরের চামড়া পুড়িয়ে আহত করে অন্যের শরীরে ধাক্কা লাগে। রবির গুলি সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা করে। ভবানী ভট্টাচার্য ও রবি ব্যানার্জী দুজনেই ধরা পড়েন। এন্ডারসন সাহেব তাঁর খয়ের খাঁ অনুগামীদের দুজনেই ধরা পড়েন। এন্ডাসন সাহেব তাঁর অনুগামীমেদের কেউ কেউ সাহেবকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হয়। এর পর যা স্বাভাবিক তাই ঘটল। সারা বিশ্ব বাংলার বিপ্লবীদের শৌর্যে অভিভূত হল। বৃটিশ তাদের জাতীয় সম্মান রক্ষা করতে ভবানী ভট্টাচার্যকে ফাঁসী দিল; এ কর্মে যুক্ত উজ্জলা মজুমদার (রক্ষিত রায়), সুকুমার ঘোষ, মধু ব্যানার্জী, মনোরঞ্জন ব্যানার্জী, সুশীল চক্রবর্তী প্রমুখকে চৌদ্দ বৎসর থেকে যাবতজীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করল। এই ‘এ্যাকশানের’ পরই ইংরেজ নিজেদের ভবিষ্যত নিরাপত্তা সুনিশ্চত করার জন্য যতীশ গুহকে আরো অনেকের সঙ্গে বিনা-বিচারে বন্দী করল। কামাখ্যা রায়কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা সাজাতে সচেষ্ট হলো। কিন্তু সে চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশ একটা মিথ্যা মামলা সাজিয়ে কামাখ্যা রায়কে দুই মাস সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করে ঢাকা জেলে স্থানান্তরিত করে। পুলিশের প্ররোচনায় জেল কর্তৃপক্ষ কামাখ্যা রায়কে ঘানি ও জাতা ঘুরাবার কাজে নিযুক্ত করে। দুই মাস কারাভোগের পর তাঁকে বিচারে বহরমপুর বন্দীশালায় পাঠায়। সে সময় শাসকশক্তি তাঁকে জানায় যে দেড় মাস পূর্বে তাঁর পিতৃবিয়োগ ঘটেছে।

এর পর বি-ভির পক্ষে বড় ধরণের কোন এ্যাকশান করা সম্ভব হয় নাই। মাঝে মাঝে ছোট ছোট বিষ্ফোরণের মাধ্যমে দলের অস্তিত্ব রক্ষিত হয়। বি-ভির সংগঠন তখন নিম্নগামী। কিন্তু কয়েকজন কর্মী তখনও নিজেদের পুলিশের দৃষ্টির অগোচরে থেকে অত্যন্ত সংগোপনে ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে সংগঠনকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ১৯৩৮ সালে শাসক বিপ্লবী বন্দীদের মুক্তি দিল। এ সময়ের ব্যবধানে যোগাযোগ ও কর্মকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বি-ভি ও সুভাষচন্দ্রের মধ্যে একটা বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বি-ভি সুভাষচন্দ্রকে সার্বিক নেতৃত্বে বরণ করে নিয়েছে। দলের নেতৃস্থানীয়রা এবং অনেক কর্মী সুভাষচন্দ্রের অনুগামীরূপে প্রকাশ্য রাজনীতিতে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করল। কামাখ্যা রায় কলকাতায় চলে এসে বালিগঞ্জে একটি মেস করে থাকতে শুরু করলেন এবং অর্থউপার্জনে মনোনিবেশ করলেন। দলের কর্মীরা কলকাতা এলে তাঁর মেসে আশ্রয় পেত। পুলিশ নিশ্চত হলো যে কামাখ্যা রায় আর সক্রিয় নন। বাস্তবে কামাখ্যা রায় তখন গুপ্ত সংগঠনের দায়িত্ব গ্রহণ করে সংগঠনকে সংহত ও শক্তিশালী করে গড়ে তুলছেন।

সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের গতি ও প্রকৃতি যেমন নিত্যই রূপান্তরিত হচ্ছে তেমনি বিশ্বরাজনীতিও ধাপের পর ধাপ উত্তরণে বিশ্বমহাযুদ্ধের পটভূমিকা রচনা করছে। বিশ্বমহাযুদ্ধের ‘ঘনঘটা’ তখন বিশ্বের আকাশ ঢেকে দিচ্ছে।



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন