আধুনিক বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে প্রথমেই যাঁর কথা বলতে হয়, তিনি বুদ্ধদেব বসু। বুদ্ধদেবের নায়িকারা আত্মমর্যাদাসম্পন্না সম্পুর্ণা নারী -- সে গৃহস্থ বধু নীলিমাই হোক, কি কলেজে পড়া অপর্ণাই হোক। বুদ্ধদেবের লেখায় নারী উপস্থিত হয় তার সমস্ত পারিপার্শ্বিককে নিয়ে। ‘শিশির, ঘাস, কাঁচা নরম গোলাপ রোদে, টাটকা সবুজ নরম গন্ধ বাতাসে -- তন্বী, শুভ্রা --টুকটুকে লাল গায়ের জামা, ধবল শাড়িতে লাল পাড় জড়িয়ে... আলোর মত।’
কখনও বা নারীর আগমনেই রঙিন আভা সমস্ত পারিপার্শ্বিকে... ‘চোখ নামাতেই মনে হল কাগজে যেন সবুজ একটা আভা পড়েছে, আর তার কলমের চিক্কণ কালো শরীরে একটি রেখার ঝিলমিলি। ফিরে তাকিয়ে দেখল- তন্দ্রা। লম্বা, লাল পাড়ের কচিপাতা রং-এর শাড়ি, দাঁড়িয়ে আছে তার স্তব্ধ ঘরটিতে রঙের ঘন্টা বাজিয়ে।’
কিংবা ‘পাতলা ছিপছিপে মেয়ে, শ্যামল রঙ, ফিকে নীল শাড়ি পরে কলেজে আসে। সরু হাতে একটি মাত্র চুড়ি, মাথার কাপড়ের চওড়া পাড় মুখখানাকে ঘিরে আছে।’
ও পার বাংলার কবিদের মধ্যে প্রথমেই নজরুল। বাংলার বধূর চিরন্তন রূপটি বার বার ফুটে উঠেছে তাঁর লেখায়। অন্যদের লেখায় নারী প্রবলভাবে বিদ্যমান অনেক সময়ই, তবু তেমনভাবে নারীর সাজপোষাকের বর্ণনা পাই না। কবি শামসুর রহমান, জসীমুদ্দিন, মীর মোশারফ হোসেন, বা সেলিনা হোসেন কিংবা হুমায়ুন অহমেদের মত গদ্যকার--- কারো লেখাতেই নয়।
পরবর্তীকালের গদ্যে শীর্ষেন্দুড়-সুনীল-সমরেশ বসু-সমরেশ মজুমদার বা আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-প্রফুল্ল রায় কিংবা হালের হর্ষ দত্ত-- কিংবা কবিতায় সুনীল-শক্তি-নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী...আজকের জয় গোস্বামী-শ্রীজাত-মল্লিকা-মন্দাক্রান্তা...এঁদের লেখায় নারীর আভূষণ বর্ণনা প্রায় নেই বললেই চলে। নারীকে আপন স্ব-মহিমায় প্রকাশ হতে দেখে মেয়েরা তৃপ্তির শ্বাস ফেলেছেন অবশ্যই।
মেয়েদের লেখায় অবশ্য প্রায়ই শাড়ি, শাড়ির রঙ পেয়েছি আমরা। প্রতিভা বসুর অনেক নায়িকাই নীল শাড়িতে স্বচ্ছন্দ। বাণী বসুর গল্পে ‘সাদা বেনারসি, মুক্তোর হার আর কানের দুল আর মাথায় লম্বা বেণীতে একটা বড় সাদা চন্দ্রমল্লিকা’ মুহুর্তেই কেমন স্নিগ্ধ করে তোলে মন। বাণী বসুর গল্পে নানা শাড়ির কথা এসেছে-- পোষাকের কথা এসেছে--পড়তে পড়তেই মারাঠী বা সদ্য-তরুণী ইমন আলাদা হয়ে ধরা পড়ে পাঠকের চেতনায়।
এই আবছায়ায় নারীর সাজ বর্ণনা অবচেতনেই ছুঁয়ে ফেলে পাঠককে। নারীর ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র সুচিত্রা ভট্টচার্য-নবনীতা দেবসেন বা হালের তিলোত্তমার নায়িকাদের আভূষণ বর্ণনা প্রায় নেই বললেই চলে। এঁদের নায়ক-নায়িকাদের চরিত্রের একটা বিশেষ ভাব, একটা বলিষ্ঠ বা নেহাৎই সাদামাটা ভাবটিই পরিচয়বহন করে।
তবে সবার ওপরে বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথের ‘বাঁশী’ কবিতার সেই ‘পরণে ঢাকাই শাড়ি সিঁথিতে সিঁদুর’ বাঙালী নারীর অপরূপ একটা ছবি তৈরী করে, বাঙালির মনে নারীর এক চিরন্তন ছবি এঁকে রেখেছে।