Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
তেলাপোকার ডিম প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন অরণ্য   

বহুযুগ পরে আমার খোলা বইয়ের ধূসর মলাট আঁকড়ে ধরেছিল
একটা তেলাপোকার শুকিয়ে যাওয়া ডিম।
আমি না বুঝেই আঙ্গুলে দিলাম মড়মড় ভেঙে!
অথচ কোন একসময় সে ছিল এ ঘরের-ই কেউ,
নিবিড় প্রতিবেশি, আপন।

ক্রমশ খুলতে থাকা ভেতরের পাতা থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসা
মাংসের ধুধুন্দমার পঁচা গন্ধ!
আমার মনে পড়ে গেল, একসময় দেবতা হব ভেবেছিলাম, প্রেমি;
দেখেছিলাম হলুদ রক্ত, আকাশী স্বপ্ন; রাতের পর রাত জেগে জেগে লিখেছিলাম
সবুজ একখানা বই!

আমার রন্ধ্রগুলো ক্রমেই বুঁজে গেছে বহুবিধ লোলুপ মাটি, গন্ধ ও ঘামে,
আর বইয়ের মত কি ভীষণ ফ্যাকাসে হয়ে গ্যাছে সবগুলো পাতার মাঠ!
আমি বুঝতে পারিনি তেলাপোকারাও বই ভালোবাসে,
চায় পড়তে।

রোজ রোজ উঠে গেছি ব্যস্ততায় ছেড়ে,
তুলে রেখে দিয়েছি নাগালের বাইরে, যাতে পড়তে পারে না কেউ, ধরতে।
কিন্তু এই ভেঙে দেয়া ডিমটাই বলে দিচ্ছে, তারাও পড়ত,
ভালবাসত গোপনে, আমার অগোচরে!
অথচ যারা ছিল ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে, হাত বাড়ালেই পেতে পারত বই,
তারা অনায়াসেই সবগুলো বই একদিন বেঁচে দিয়ে চলে গিয়েছিল সিনেমায়!

আমি জানি সিনেমায় বই থাকেনা, থাকেনা তেলাপোকা কিংবা ডিম।
আমার ট্রাঙ্ক বন্দি জরাজীর্ণ ন্যাপথালিন মোড়ানো হৃদপিন্ডটাকে প্রশ্ন করেছি শতেক-
‘বইটা লিখেছিলে কেন? চেয়েছিলে পড়তে অত আগলে রেখে বারবার?
যখন তুমি চশমা পুষবে, তখন কি একবারো মনে হবেনা,
অপচয় ছিল?’

যে কটা পাতা ভাঁজ করা ছিল, এখনো ঠিক সেভাবেই আছে!
যে ক’টা লাইন করেছিলাম চিহ্নিত, তারা মিশে গিয়েও হয়ে আছে যেন স্পষ্ট,
অথচ ভেতরের পাতায় এই যে ছোট ছোট অসংখ্য ছিদ্র;
তবে কি আরো অনেকেই ঘুরে যেত এসব সবুজ পাতা, জানত পড়তে,
ভালবাসত লুকিয়ে, এ ঘরেই, আপন?
সবশেষে পাতায় লেখা ছিল কিছু, আঁকা হয়েছিল কয়েকটা অঙ্কন,
আমি শেষ পাতাটি খুঁজতে গিয়ে দেখি, দিগন্ত জোড়া ফাঁকা কিছু পাতা!

কে যেন বলেছিল ‘এত ঝুলকালির ঘরে লিখতে নেই বই, রাখতে।’
আমার পরিচ্ছন্ন উজ্জ্বলতা না থাকলেও ভালবাসা ছিল, ছিল প্রেম, সততা,
এবং পড়তে পারার ক্ষমতা আঁধারেও!

আমার ঝুলকালির ঘরে তেলাপোকা থাকলে, বইয়েরো থাকা উচিত,
ভাবিনি কখনও।
আমার প্রতিবেশিকে বলতাম, ‘বেয়ারা, উন্মাদ, নেশাগ্রস্ত কুকুর,
কিছুই বোঝেনা, নষ্ট !’
অথচ সে বিশ্বস্তের মত শুনিয়ে যেত আমাকে প্রায়শঃ কয়েকটা পাতা লেখা হলেই,
‘তোমার বইয়ের উপরে মরে শুকিয়ে যাওয়া ডিম পাবে
একদিন!’
তেলাপোকাকে ঘৃণা করা উচিত নয়, যদি বই পড়ে, ভালবাসে;
বুঝিনি!
আমার বহুযুগ পুরোনো ধূসর এই বইয়ের কথা যারা জানত, তারা সবাই বেমালুম
সিনেমা থেকে ফিরে এসে গল্প গল্প করতে করতে খেয়ে ঘুমিয়ে যেত-
আরেকটা ভিন্ন সকালের জন্য আমোদে, আর আমি রাতভর লিখে
পাতার পর পাতা ভাঁজ করে করে চিহ্নিত কালিতে
ভুলে গেছি ঘরের অন্য সবের কথা, যারা আমার কাছেই ছিল,
খুব কাছে, এমনকি টেবিলের নিচেও!

তারা আমাকে ভালবাসত, আমার বইটাকে, লেখাকে এবং পড়ত আদরে, গোপনে!
আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেই তারা নির্ঘাৎ বেরিয়ে পড়ত উল্লাসে!
ছুটোছুটি আর লুটোপুটিতে বুলিয়ে যেত নিখাঁদ পরশ!
কতদিন বিরক্তিতে দিয়েছি গালাগাল, অভিশাপ, অথচ তারা ক্ষমা করেছে!
আর যাদের করেছিলাম সমাদর, সম্মান, প্রেম এবং দিয়েছিলাম
বইখানা বাড়িয়ে, তারা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে হাসতে হাসতে এরপর
নাটক দেখবে বলে গিয়েছিল থিয়েটারে!

বস্তুত ভুলে যাবার মত কোন অভ্যাস কখনোই ছিলনা আমার।
তবুও ভুলে যেতাম, পাছে বইটা শেষ হয়ে গেলে আমি পড়তে পারিনা অন্য কিছু।
আমি ভেতরে ভেতরে যতটা ক্ষয়ে যেতাম, ততটাই টুকে রাখতাম রোজ
একটা ডায়েরিতে, যেটা হারিয়ে ফেলেছিলাম বেশ কিছু বছর আগে
এক সন্ধ্যায়!
সেখানে একদিন-ই খালি লিখেছিলাম একটা তেলাপোকা,
তরপর আর লিখিনি!
হয়ত সেটা না হারালে আজ এই ডিমগুলো শুকোতনা এভাবে!


যারা মদ খেত, তাদের আমি গালি দিতে পারতাম না পরে, কারণ শুনেছিলাম
মদ ও বই খুব কাছাকাছি,
কিন্তু উন্মাদ মাতলামি আর এত বছর পরের শুকিয়ে যাওয়া এই ডিম
এতটা নিবিড় জানতাম না!
অথচ আমার এই হাত-ই একদিন মেঝেয় চিত হয়ে মরে পড়ে থাকা
তেলাপোকাকে তুলে ছুড়ে ফেলেছিল বাইরে!

সে সময় আমার ঘরে প্রায়শঃ দেখতাম মরে শুকিয়ে উড়ে বেড়ান
কুঁকড়ে যাওয়া মাকড়সার শরীর!
কৌতুহলে হাতে নিয়ে দেখতাম কি ভীষণ ওজনহীন!
আমি হাসতাম অনেকক্ষণ এই ভেবে,
‘কি বিভৎস কুঁকড়ে গেছে, কত অবিশ্বাস্য ওজনহীন!’
অবশেষে ময়লার সাথে মিশিয়ে দিতাম, পরে ফেলে দেব বলে।
দিয়েওছিলাম, আর তারপর নিয়মিত বই নাগালের বাইরে তুলে রেখে আমিও
যেতাম সিনেমায়, থিয়েটারে!
বাড়ি ফিরে গল্প করতে করতে খানা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তাম ভিন্ন এক সকালের জন্য।

তখন আমার বইটাকে সঙ্গ দিত ছুঁড়ে ফেলা সেই সব তেলাপোকাদের প্রেতাত্বা,
শুকিয়ে কুঁকড়ে যাওয়া মৃত মাকড়সার শরীর;
যারা ভোর হবার আগে আমার জন্য তাদের ডিমগুলোও রেখে
যেত লাগিয়ে, আর উড়ে বেড়াত ওজনহীন!

এতযুগ পরে আমার ধূসর বইয়ে গুড়িয়ে যাওয়া এ ডিম
বুঝিয়ে দিচ্ছে-
কিভাবে মরে শুকিয় কুঁকড়ে ওজনহীন হয় একেকটা আঁধারচারী প্রাণ,
শুষ্ক তেলাপোকার ডিম এবং
সবুজ বইয়ের প্রেতাত্বা!

Comments (0) >>
Write comment

This content has been locked. You can no longer post any comment.


busy

অরণ্য
About the author:
জন্ম ১৯৮১-তে বাংলাদেশের রাজশাহীর জেলার পবা থানার সবসার নামক গ্রামে। লেখালেখি শুরু ২০০৪-এ কবিতা দিয়ে। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় সোনাঝুরিতে ২০০৫ সালে। কবিতা লেখা দিয়ে লেখালেখির শুরু এবং এখনও কবিতা লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
Read More >>
 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন