Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
মাধ্যমিকে প্রথম আল আমীন মিশন প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন রোহন কুদ্দুস   
আর্টিকেল সূচি
মাধ্যমিকে প্রথম আল আমীন মিশন
পাতা 2

মাধ্যমিকে প্রথম আল আমীন মিশন:: একটা স্বপ্নপূরণের গল্প

ধরা যাক, আপনি ধর্মগতভাবে মুসলমান এবং পশ্চিমবঙ্গের মফস্বলে বড় হয়েছেন। তাহলে আপনি নিশ্চয় শুনেছেন কীভাবে আপনার বাবা-কাকা বা নিকট আত্মীয়রা অথবা তাঁদের পরিচিতরা মুসলমান হওয়ার দোষে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতারিত হয়েছেন। অথবা ধরছি আপনি কোলকাতার মত কোনো বড় শহরে মানুষ হয়েছেন তাতেও কোনো ব্যতিক্রম নেই। ইস্কুল-কলেজের রেজাল্ট থেকে আরম্ভ ক’রে কর্মক্ষেত্রে কীভাবে তাঁদের নানাভাবে পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে--এসব আপনার কন্ঠস্থ।

এইটুকু পড়ে যাঁরা আমার মাথার খোঁজ করছেন, তাঁদের জানাই, শুধুমাত্র মুসলমান হওয়ার জন্যে আমায় কখনও কোনও প্রতিযোগিতায় বা কর্মক্ষেত্রে কোনোরকম অসুবিধা ভোগ করতে হয়নি। তাহলে? এমন একটা আপত্তিকর এবং উস্কানিমূলক আরম্ভ? আছে, কারণ আছে একটা গল্প শোনাবো। সেই গল্প শুনতে শুনতে আপনি যাতে না ঘুমিয়ে পড়েন। তার ব্যবস্থা করলাম।

যখন বলতাম, আমি আল আমীন মিশনে পড়েছি, অনেকেই নাক কুঁচকে জিজ্ঞাসা করতেন ‘আল কায়দার কিছু?’-লে হালুয়া! কিছু বলতে পারতাম না। তাই মরিয়া হয়ে বলতাম --- ‘সেটা এমন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমিকে বা উচ্চমাধ্যমিকের গড় রেজাল্ট নরেন্দ্রপুর বা সাউথ পয়েন্টকে টেক্কা দেয়।’ অবিশ্বাসী মুখ-চোখ দেখে চুপসে যেতাম। ভয়ে কিছু বলতাম না। কিন্তু এখন অন্ততঃ এটুকু বলতে পারব--‘আমি আল আমীন মিশনে ফাইভ থেকে টুয়েলভ্ পড়েছি। নাম শোনেন নি?’ বাপি বাড়ি যা! এবার ওখান থেকেই তো মাধ্যমিকে ফার্স্ট হল।

লিখতে লিখতে চোখ জলে ভরে আসছে। সেদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় যখন আসরাফুলদা’র এস.এম.এস পেলাম, তখনো রাজ্যের মানুষ জানেন না একটা স্বপ্নপুরণের প্রতীক হিসাবে আল আমীন মিশন আরো একবার নিউজ মিডিয়ার প্রিয়তম বাইট হ’য়ে উঠেছে। জানি না কতজন, মনেরেখেছেন গত বছর জয়েন্ট এন্ট্রান্সের ফলাফল। কিন্তু তখনো আমার এত আনন্দ হয় নি। মেডিকেল তৃতীয়, পঞ্চম, অষ্টম হওয়ার পরও শুধুমাত্র ভগবানে ভয় পাওয়া সংবাদপত্রটি বেসুরো গাইলো। কীসের যেন একটা গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এক জায়গায় এত ভাল ফল হয় কী করে? (জানি না যখন আরিফ ফার্স্ট হল, তখন তারা কী লিখেছে।) আগেও ভালো রেজাল্ট হত, কিন্তু এবার চোখে জল এল। কেন? অবশ্যই প্রথম স্থান একটা অন্য জিনিস। কিন্তু তার থেকেও বড় ব্যাপার হল এটা একটা প্রতীক। একটা আশার স্থল। এইটুকু বুঝিয়ে দেওয়া যে, যোগ্যতাই শেষ কথা। সেখানে জাতপাতের বিভেদ খুব পলকা। আর সবার থেকে বড় ব্যাপার এই ফার্স্ট rank-টা আমাদের স্বপ্নপূরণ। সেই ১৯৯৯ থেকে দিন গোনা হচ্ছে। এতদিনে হল। চোখে জল আসবে না?

তবে সত্যি বলতে কী, সংবাদমাধ্যমে কান না দেওয়াই ভালো। কে কী বলল, তাতে কী যায় আসে? এবার মাধ্যমিকে ফার্স্ট না হয় হল। মানলাম আরিফ ৭৯৬ পেয়েছে ৮০০-র মধ্যে। কিন্তু বাকিরা? আগের বছরগোলোতে দেখেছেন তো ফার্স্ট বয়দের ইস্কুলের গড় ফলাফল? সেই জায়গায় কিন্তু আল আমীন মিশন একটা দৃষ্টান্ত! ছেলেমেয়ে মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮২ জন। ১৮১ জন প্রথম বিভাগে। আর স্টার? মাত্র ১৫৮ জন! আচ্ছা স্টার ছাড়ুন। ওটা নাকি এখন জলভাত। ৯০% -এর ওপর পেয়েছে ৩৫ জন। বিখ্যাত ইস্কুলগোলোর সঙ্গে তুলনায় গেলাম না। কাউকে লজ্জায় ফেলার ইচ্ছে নেই।

এই পর্যন্ত লিখে একবার পড়লাম যতটা লেখা হয়েছে মনে হল, যেন একটু বেশি রাগী-রাগী লেখা হয়ে গেল। তার থেকে তার থেকে আসুন ফ্ল্যাশব্যাকে যাওয়া যাক। ১৯৭৬-এর ২১শে ফেব্রুয়ারি এক তরুণ হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুরের থেকে কিছু দূরে খলতপুর গ্রামে শুরু করেছিলেন খলতপুর জুনিয়ার হাই মাদ্রাসা। স্বাধীনতার পরবর্তী বাঙালীর ইতিহাসে সেই তরুণের নাম অক্ষয় হয়ে থাকবে--- নুরুল ইসলাম (তাকে আমি শুধু স্যার বলেই ডাকি।) একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিসাবে মানুষ যদি তাঁর নাম মনে রাখে, তাহলে অবশ্য খুব অবাক হব না। বাঙালীর স্মৃতিশক্তির দৌড় সবাই জানেন। যাই হোক বলি শুরুর কথা।

কিছু একটা করতে হবে। একটা পিছিয়ে পড়া জাতিকে টেনে তুলতে হবে। দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য সেটা প্রচন্ড জরুরীও বটে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অজ্ঞতার অন্ধকূপ থেকে আলো দেখাতে হবে এই রাজ্যের অন্যতম একটা জনসংখ্যাকে। এই ছিল স্বপ্ন। খলতপুরে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই পথ চলা শুরু হল। গ্রাম থেকে মুষ্টির চাল এনে শুরু করেছিলেন। সেই ভিক্ষাপাত্র আজো তাঁর হাতে। সহৃদয় বিত্তবানদের দানের অর্থ মফস্বলের একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ রাজ্যেসেরা। ১৯৮৪তে মাদ্রাসার পাশাপাশি গড়ে উঠল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক কালচার। আর ১৯৮৭তে এরই নাম বদলে রাখা হল আল আমীন মিশন। ১লা জানুয়ারি, ১৯৮৭। তারিখটা মনে রাখা দরকার। মাত্র ২০ বছর। তার মধ্যেই স্বপ্নদেখার সেই চোখ দুটোতে আজ গর্ব উপচে পড়ছে।

স্যার অনেক অনেক আগে একটা ছবি এঁকেছিলেন। একটা ফুটবল মাঠের দু’প্রান্তে দুটো বাড়ি। একটা খলতপুর মাদ্রাসা। অন্যটা আল আমীন মিশনের হোস্টেল বিল্ডিং। ১৯৯৩-এ আমি যখন ভর্তি হই, তখন সবেমাত্র হোস্টেলটা মাথা তুলছে। আমরা থাকতাম মাদ্রাসারই ঘরগুলোতে। মাদ্রাসার ক্লাস হত নীচের তলায়। আর আমাদের ক্লাস হত ওপরে। আমাদের বেডরুমে মাগরেবের নামাজের পর কখনও কখনও আমাদের নিয়ে স্যার ছাদে বসতেন। শোনাতেন স্বপ্নের কথা। আমরা বলতাম ‘ভোকাল টনিক’। চারিদিকে তখন অন্ধকার। মাথার ওপর একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠছে। ঐ তারাদের পাশে গিয়ে নাম লেখাতে হবে এমনটাই কথা ছিল।

নিজেকে তিনি পাগল বলেন। সত্যিই পাগল কিনা আমারও সন্দেহ হত। মাথায় লাখ-লাখ টাকার দেনা নিয়ে যিনি শত শত ছেলে-মেয়েকে নিশ্চিত ভবিষ্যতের ঠিকানা দেবেন পণ করেছেন, তাঁকে আর যাই হোক সাধারণ মানুষ বলা মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। কিন্তু যিনি জীবনপণ ক’রে একটা জাতিকে আলোদেখাচ্ছেন, তাঁকে কাঁটাও তো কম মাড়াতে হয়নি। মহাজন এসে অপমান করে যাচ্ছে। টাকা চাইতে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা দরজা। স্ত্রীর গহনা বন্ধক রেখে শিক্ষকদের মাইনে দিতে হয়েছে। তবু স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়নি। প্রতিবন্ধকতা যত বেড়েছে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তাঁর জেদ। মাঠের দুদিকে দুটো বাড়ি গড়ে উঠেছে আজ। যাঁরা আল আমীন মিশনের খরতপুর ক্যাম্পাসে গেছেন, তাঁরা জানেন এখন দুটো বাড়ি নয় শুধু। পাশে আছে ছেলেদের ইস্কুল বাড়ি (১৯৯৮), সিনিয়ার ছেলেদের হোস্টেল (২০০১)। ছেলেদের সাথেই গড়ে উঠেছে মেয়েদের জন্যে আলাদা একটা হোস্টেল এবং ইস্কুল নিয়ে স্বতন্ত্র আর একটা অংশ (২০০০)। সারা রাজ্যে শিক্ষা আন্দোলনের যথাযথ প্রসারে ২০০২ বেলপুকুর, ২০০৩-এ পাথরচাপুড়ি, ২০০৬-এ ধূলিয়ানে খোলা হয়েছে আল আমীন মিশনের শাখা। জয়েন্ট এন্টান্সের কোচিং সেন্টার তো কোলকাতার যে কোনও কোচিং সেন্টারকে বলে বলে নক আউট ক’রে দেবে। কারণ একটাই, এখানে টাকা দিয়ে rank কিনে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয় না।

এবার আসুন এক্কেবারে প্রথম প্যারাগ্রাফে ফেরা যাক। অনেকেই প্রশ্ন করেন শুধুমাত্র মুসলমান ছাত্র-ছাত্রী কেন? কেন আল আমীন মিশনের দ্বার উন্মুক্ত নয় সর্বসাধারণের জন্য? এর উত্তরে স্যার বলেন, ভারতের সার্বিক উন্নতির জন্যে এই পিছিয়ে পড়া সমাজটার উন্নতি প্রয়োজন। একশো কোটির এই দেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী মোটেই সংখ্যালঘু নয়। তারা পিছিয়ে থাকলে দেশের সোনালী দিন আসবে কীভাবে? এখানে যেসব ছেলে-মেয়েদের তুলে আনা হয় সর্বসাধারণের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামলে তারা এখানে পৌছানার সুযোগ পেত না। সেই সম্ভাবনাময় মস্তিষ্কগুলোকে ঘষে মেজে ঝকঝকে তলোয়ার বানানো হয়। আর তার প্রতিফলন প্রত্যেক বছর পাওয়া যায় মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক ফলাফলে।



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন