Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
রাতপাখি প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আইভি চ্যাটার্জী   
আর্টিকেল সূচি
রাতপাখি
পাতা 2
পাতা 3

অফিস থেকে ফেরার সময় রোজ এমনিই মাথাটা ধরে থাকে, তারপর আজ রাস্তায় নেমেই জানা গেল বাস চলছেনা। বাসচালকদের ধর্মঘট। তার মানে এই এখন দৌড়োদৌড়ি করে ট্যাক্সি ধরো, গুচ্ছের টাকা নষ্ট করে বাড়ি ফেরো। অনসূয়ার ক্নান্তিতে কালো হয়ে আসা মুখটা উদ্বেগে আরো কালো হয়ে ওঠে। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে মা চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন। একবার সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়ে গেছে, মায়ের মনের ওপর কোন চাপ পড়ুক এটা কোনমতেই কাম্য নয়। একেই অনসূয়াকে নিয়ে মায়ের মনে এক চাপা কষ্ট।

‘সংসারের দায় নিতে গেয়ে তোর আর বিয়ে করাই হল না’, ‘এমন মা আমি যে তোর জন্যে কিছু করতেই পারলাম না’- মায়ের সব সময়ের আক্ষেপ। অনসূয়া বোঝান, আজকের দিনে এমন বিয়ে না-করা কত মেয়ে-পুরুষ..একটা বিয়ে আর জীবনের লক্ষ্য নয় কারো। মা মানেন না, পুরোনো সময়ের ধ্যানধারণা অন্যরকম। মেয়ের যে নিজের একটি সংসার হল না, তিনি চলে গেলে মেয়েকে কে দেখবে, তেমন পড়াশোনাও তো করাতে পারেন নি যে ভালো রোজগারের চাকরি করবে - মা দুশ্চিন্তায় দীর্ণ হন।
ব্যাগের মধ্যে মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতে সম্বিত ফেরে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মনটা কোথায় কোথায় ঘুরে এল এতক্ষণ!
- ‘অনুদি, তুমি কোথায়?’ পাশের বাড়ির সমীরদার বৌয়ের গলা।
‘এই তো, বেরিয়ে পড়েছি, বাস বন্ধ, তাই দেরি হচ্ছে, মাকে বলে..’ কথা শেষ হয় না, ফোনে উদ্বিগ্ন গলা ভেসে আসে, ‘অনুদি, তাড়াতাড়ি বাড়ি এসো, জেঠিমা বাথরুমে পড়ে গেছেন।’

রাস্তার মধ্যেই বসে পড়তে ইচ্ছে করে অনসূয়ার। এমন রোজগার নেই যে, সবসময়ের জন্যে মায়ের একজন সঙ্গী রাখবেন। তবু কাজের মাসিকে বলা আছে, এ বাড়ি ও বাড়ির কাজ শেষ করে বাকি সময়টা যেন মায়ের কাছেই থাকে, অন্তত অনসূয়া যতক্ষণ বাড়ি না ফেরেন। এমনিতে মা শক্ত সমর্থ আছেন, নিজের কাজ নিজেই সব করেন। তবু এই বাড়তি সতর্কতা নিতে হয়। একবার অ্যাটাক হয়ে গেছে যে।

দাদা বিয়ের এক মাসের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে পাড়ার মধ্যেই বাড়িভাড়া করে আছেন, বাড়িতে থাকলেও বৌদিকে মাকে সঙ্গ দেবার কথাটা কি বলা যেত! তার চেয়ে এই ভালো। সম্পর্কের সুতোটা টানটান হয়ে থাকলেও একেবারে ছিঁড়ে যায় নি। অন্তত সময়- অসময়ে সাড়া পাওয়া যায়।

বাবা অচিন দেশে পাড়ি দিলেন যেদিন, তখন অনসূয়া স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার হলে বসে। দাদা কাঠবেকার, বোন মাত্রই ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। সবে ক’মাস হল, অনেক কষ্টে তৈরী নতুন বাড়িতে উঠে এসেছেন দমদমের কলোনি ছেড়ে... বাবার আর নিজের বাড়িতে থাকা হল না।

‘পথ দুর্ঘটনায় মৃত ১’ শিরোনামে খবর হয়েছিল, টানা তিনদিন হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর লড়াই। সরকারী হাসপাতালের দমবন্ধ করা পরিবেশে আর হাসপাতালকর্মীদের নিতান্ত অমানবিক আচরণ বাবার মৃত্যুর কারণ। হয়ত ভালো হাসপাতাল বা নার্সিং হোমে নিয়ে গেলে বাবা বেঁচে উঠতেন। মায়ের সেরিব্রাল অ্যাটাক হবার পর তাই অনসূয়া মাকে প্রাইভেট নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়েছিলেন। দাদা-বৌদি দুজনেই খরচের কথা তুলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন, তবু জেদ ছাড়েন নি অনসূয়া। শম্পার বিয়ে দিয়েছেন তার ক’মাস আগেই। আশা ছিল, শম্পা সহায় হবে। শম্পা স্কুলে চাকরির করেও দু ব্যাচ ছাত্রছাত্রী পড়ায় বাড়িতে। নিজে কোনমতে আই.এ পাশ, দাদা টেনেটুনে গ্র্যাজুয়েট... শম্পার পড়াশোনায় মাথা ভালো। ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত পড়ানো বিলাসিতা ছিল তাঁদের কাছে, তবু অনসূয়া জোর করেছেন। অন্তত একজনের জীবননদী মসৃণপথে এগিয়ে যাক। দাদার চাকরিবাকরি হলনা, পাড়াতুতো কাকা-দাদাদের ধরে এল.আই.সির এজেন্সি করানো, ক্লায়েন্ট জোগাড় করা... কি সব দিন গেছে। বৌদিদের বাড়ির অবস্থা রীতিমত ভালো, বিয়ের আগেই দাদার রোজগারের পরিমাণ সম্বন্ধে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তখন অনসূয়া কোনো ট্রেনিং ছাড়াই প্রাইভেট নার্সিংহোমে বাতের সেবিকা হিসেবে ডিউটি করছেন। সেবিকা নামটাই গালভরা, আসলে আয়ার কাজ। পাড়ায় সে কথা বলতেন না অবশ্য। আশি টাকা রোজের হিসেব।

পাড়াতেই রুমেলাদি বুটিক খুললেন, মাসিক মাইনের কাজে সেই ঢুকে পড়া। সেই সঙ্গে রাত জেগে শাড়ির ফলস লাগানো, ব্লাউজ-সালোয়ার কামিজ-ছোট মেয়েদের ফ্রক তৈরী করা... মা খুব ভালো সোয়েটার বুনতেন...কাঁথা তৈরী করতেন... সেটা উপরি রোজগার হত। রুমেলাদি বিয়ের পরে মুম্বাই চলে গেলেন, তখন কিছুদিন পাড়ার মধ্যেই নতুন বিউটি পার্লারে বিনুদার বৌয়ের শাগরেদি করেছেন। মাসে তিন থেকে চার হাজার চাকা হত। এই চাকরিটাও তো বিনুদার তদ্বিরেই। ‘মাসে সাড়ে চারহাজার টাকা... তা ছাড়া পি.এফ আছে, ই.এই.আই আছে’, বিনুদাই বুঝিয়েছিলেন, ‘আস্তে আস্তে ওরাই তোকে কম্পিউটার চালানো শিখিয়ে নেবেন, নতুন অফিস করেছে, এর বেশি টাকা দেবার ক্ষমতা নেই,... আমার বন্ধু, বিশ্বাসী লোক অথচ কম মাইনে নেবে এমন পাওয়া তো সহজ নয়..লেগে থাক...পরে ভালো হবে’।
লাগলে তুক, না লাগলে তাক!

অনসূয়ার তো আর সার্টিফিকেটের জোর নেই যে দরাদরি করবেন। এ অন্তত ভালো জায়গায় ভালো পরিবেশে কাজ। আন্তরিকতারো একটা মূল্য আছেই। ওপরওয়ালা অনসূয়ার কাজে খুশি। সবে থিতু হচ্ছিলেন।
এখন যে কি করেন!
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে প্রথমে ফোন দুটো করে ফেললেন। দাদা আর শম্পা। তারা এসে কি সাহায্য করবেন কে জানে, অন্তত ‘মায়ের শরীর খারাপের খবরটা দিলে না কেন’ বলার মুখ বন্ধ করাটাই প্রথম কাজ।

পাড়ার ছেলেদের সাহায্যে আরো দেড় ঘন্টা পরে হাসপাতালে মাকে ভর্তি করানো গেল। এই দেড় ঘন্টা যে কিভাবে কেটেছে, কি করে বাড়ি ফিরেছেন..ততক্ষণে অচৈতন্য মাকে সমীরদার বৌ আর কাজের মাসির ডাকে এসে পড়া পাড়ার ছেলেরা খাটে তুলে শুইয়ে দেবাশিস ডাক্তারকে ডেকে এনেছে, ‘সেরিব্রাল, এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে’ শুনে অ্যাম্বুলেন্স আনানো.. ভর্তি করার নানা ঝকমারি পেরিয়ে এইমাত্র মাকে আই.সি.ইউ-তে ঢোকানো হয়েছে। করিডরে দাঁড়িয়েই বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিলেন অনসূয়া, দাদা এসে একটা চেয়ার টেনে বসালেন। দাদা এসেছেন খবর পেয়েই, এইটুকুই স্বস্তি। আবার সরকারি হাসপাতাল।

মনের মধ্যের খুঁতখুঁতুনি থাকছেই।
----‘জিজ্ঞেস কর না দাদা, মাকে আমরা যদি অন্য কোন নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে চাই! কোন রিস্ক নেই তো?’
---‘ তোর শুধু শুধু টাকা খরচ না করলে শান্তি হয় না নাকি? সরকারি হাসপাতালের এক একজন ডাক্তারের মত ডাক্তার আছে ও সব নার্সিংহোমে? মাকে কোন ডাক্তার দেখছেন এখানে, দেখলি?’
দাদাকে আর কিছু বললেন না অনসূয়া। শম্পা তো এলই না। ফোনে খবর নিচ্ছে অবশ্য। ‘কাল মাম্পুর পরীক্ষা রে দিদি, নইলে আমিও তোর সঙ্গে রাতে থাকতাম।’


 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন