Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ৪ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সত্যব্রত মজুমদার   
আর্টিকেল সূচি
নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ৪
পাতা 2
পাতা 3
পাতা 4

এর আগে

বি-ভি যে কয়জনা তখনও গ্রেপ্তার এড়িয়ে জেলের বাইরে ছিলেন তাদের গ্রেপ্তার করার জন্য সরকার তখন পাগলপারা। ওদের তখন International Conspiracy দায়ের করার ভাবনা। এ case দায়ের করতে গেলে চঞ্চল মজুমদারকে তাদের বিশেষ প্রয়োজন। কিন্তু বিপ্লবীদের বাংলার মাটিতে বন্ধুর অভাব কোন দিনই হয় নাই। হাজরা রোডের শ্রীশম্ভু রায় চৌধুরী, বেহালার রাধাগোবিন্দ পান্ডে, যাদবপুরের সুশীল মজুমদার এবং সর্বশেষ হাজরা লেন ও ২৪ পরগণার বারাসাত এর ঝিকিরা গ্রামের জীতেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্যের স্ত্রী সুষমা সুন্দরী দেবী প্রচন্ড বিপদের ঝুঁকি নিয়ে চঞ্চল মজুমদারকে আশ্রয় দিয়ে পুলিশের সমস্ত প্রচেষ্টা বিফল করে দিলেন। চঞ্চল মজুমদারকে পুলিশ শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয় ১৯৪৫ সালের সুরুতে। যুদ্ধপরিস্থিতি তখন পরিবর্তিত,- International Conspiracy Case রুজু করা তখন আর সম্ভব নয়। [ এ সম্বন্ধে শিশির বসুর ধারণা সঠিক কি ছিল তা জানতে পারা যায় তাঁর “বসুবাড়ী” পুস্তকে বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বিবৃত নিম্নোক্ত ছোট ছোট মন্তব্য থেকে। তিনি তাঁর উপরিউক্ত পুস্তকের ১৭০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন (১) “ভাবলাম এরোপ্লেনে করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছ কেন, এত তাড়াহুড়া কিসের জন্য? হয়তো তাড়াতাড়ি আমাদের একটা গোপন বিচার করতে চায়। সাজাটা যে চরম হতে পারে তাও মনে হল। সুধীর বক্সীর গ্রেপ্তারের খবর ক’দিন আগেই খবরের কাগজে পড়েছিলাম। পুরো দলটাই ধরা পড়ে যায়নি তো।” আবার ১৭৪ পৃষ্ঠায় লিখেছেন “ভাবতে লাগলাম আমাকে নিয়ে এরা কী করবে। যে নাটকীয়ভাবে এরা আমাকে লাহোর দূর্গে এনে ফেলল, নিশ্চই ব্যাপারটা অনেক দূর গড়িয়েছে। এবং গুরুতর কিছু ঘটতে যাচ্ছে আমি বুঝতে পারছিলাম। এরা সম্ভবত আমাদের দলের অনেককেই ধরে ফেলেছে। আমার মনে হয়েছিল এরা খুব সম্ভবত আমাদের লুকিয়ে আমাদের বিচার করবে এবং কঠোর সাজা দেবে। কম করে হলেও যাবজ্জীবন কারাদন্ড তো হবেই, কারুর কারুর ফাঁসিও হতে পারে। বিচারের সময় আসামীর কাঠগড়ায় কাকে কাকে দেখব আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম।” তিনি তাঁর একই বইএর ১৮২ পৃষ্ঠায় আরো লিখিছেন “প্রথম দিকে আমার নানা রকম আশঙ্কা হলেও, জিজ্ঞাসাবাদের শেষের দিকে ওদের কথাবার্তা থেকে আমার ধারণা হলো যে, পূর্ব-এশিয়া থেকে আগত আমাদের বন্ধুদের এরা ধরতে পারেনি। সুতরাং আমাদের বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রের একটা কেস খাড়া করা সরকারের পক্ষে খুবই শক্ত। অন্যদিকে বুঝলাম যে, ১৯৪১ সালে রাঙাকাকাবাবুর অন্তর্ধানে আমার ভুমিকার ভিত্তিতে কোন কেস খাড়া করার কোন ইচ্ছা তাদের নেই। আরো বুঝলাম, যে সূত্র তাদের কাছে ব্যাপারটা ফাঁস করে দিয়েছে, রাজনৈতিক কারণে তাদের পর্দার আড়ালে রাখাই তাদের পক্ষে যুক্তিযুক্ত। তাহলে রাঙাকাকাবাবুর বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার ও দেশের বিশেষ যে রাজনৈতিক গোষ্ঠীর যে গোপন আঁতাত হয়েছে, সেটা ধরা পড়বে না, ভবিষ্যতেও চালু থাকবে।”

শিশির বসুর অনুমান বাস্তবে সত্য। ধীরেন সাহারায়ের গ্রেপ্তারের পরই সুধীর বক্সী, শিশির বসু প্রমুখ গ্রেপ্তার হলে সরকার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মামলা ফাঁদতে ইচ্ছুক ছিল। সরকারের এ অভিপ্রায়কে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব ছিল না দুটি কারণে। প্রথমত টি.কে. রাও প্রমুখকে গ্রেপ্তারে অক্ষমতা; দ্বিতীয়ত, পুলিশ যে সামান্য কিছু দগ্ধবিশিষ্ট কাগজপত্র শহীদ গোপাল সেনের কাছ থেকে পেয়েছিল তাতে সত্যব্রত (চঞ্চল) মজুমদারকে গ্রেপ্তার করতে না পারলে এবং দলনেতা কামাখ্যা রায়কে পরস্পর যুক্ত করতে না পারলে ষড়যন্ত্র মামলা ফাঁদা সম্ভব ছিল না। এ কারণেই পুলিশ এদিকে চঞ্চল মজুমদারকে গ্রেপ্তার করতে আর অন্যদিকে কামাখ্যা রায়কে কোন রকমে জ্যোতিষ বসুর বাড়ীর কাছে নিয়ে গ্রেপ্তার করে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত থেকে আগত ডাঃ পবিত্র রায়ের দলের সঙ্গে একটা যোগ-সাজসের প্রমাণ তৈরী করতে চেষ্টা করেছিল। পুলিশের সমস্ত চেষ্টাই বিফল হয়। শেষ পর্যন্ত ষড়যস্ত্র মামলা ফাঁদার পক্ষে অসময়ে চঞ্চল মজুমদার যখন গ্রেপ্তার হন তখন কলকাতার গোয়েন্দা প্রধান এবং লাহোরের গোয়েন্দা প্রধান উভয়েই চঞ্চল মজুমদারকে ষড়যন্ত্র মামলা ফাঁদার ভয় দেখান। চঞ্চল মজুমদার তখন তাঁদের দুঃখ করে বলেছিলেন যে তাঁরা চাইলেও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থতিতে ইংরেজ এ রকম একটা মামলা করে অন্তত পনের বিশ জনকে ফাঁসী দিয়ে নেতাজীর কর্মকান্ডের দেশ অভ্যন্তরে বিপুল ব্যাপকতাকে য়ড়যন্ত্র মামলার মাধ্যমে দেশবাসীর মানসপটে এনে নিজেদের সাম্রাজ্যের ভিতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না বিশেষ করে যখন নেতাজীর প্রচেষ্টা সাময়িকভাবে প্রতিহত হয়েছে। তিনি তাদের জানিয়ে ছিলেন যে বর্তমান অবস্থায় বিপ্লবীরা মনে করে বিপ্লব যজ্ঞের শিখাকে প্রজ্জ্বলিত রাখতে নেতাজীর মুক্তিসংগ্রামকে কেন্দ্র করে দেশভ্যন্তরের কর্মকান্ডের জন্য কিছু লোকের ফাঁসী হলে আগত মুক্তিসংগ্রামে তার প্রতিক্রয়া হবে মঙ্গলজনক। তিনি তাঁদের ষড়যন্ত্র মামলা ফাঁদতে অনুরোধ করেন যাতে তিনি ও তাঁর বন্ধুবান্ধব কয়েকজনকে নিয়ে দেশের ভবিষ্যত বিপ্লব আন্দোলনের জন্য একটু পাথেয় রেখে যেতে পারেন। গোয়েন্দা প্রধানরা তার কাছে তাঁর কথার বাস্তবতা স্বীকার করে।]

এর পর বৃটিশ পুলিশ বি-ভির সঙ্গে যাকেই কোন না কোন ভাবে যুক্ত মনে করল তাকেই জেলে পুরে নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে চাইল। এ পর্যায়ে বি-ভির কর্মকান্ডর পরিসমাপ্তি এখানেই। ক্রমে বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি। আজাদ হিন্দ ফৌজ আত্মসমর্পণ করলেও আজাদ হিন্দ সরকার কিন্তু আত্মসমর্পণে বিরত রইল।

যে সার্বিক মুক্তি সংগ্রাম ১৯৪৫ এ পূর্ব রণাঙ্গনে স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল-সে সংগ্রাম আজও চলমান। এর ইতিহাস লেখার প্রচেষ্টা যেমনি দুঃসাধ্য, তার ঘটনা ও ঘটনা সংঘাতের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ঠতর করে চিত্রিত করাও তেমনি অসম্ভব। আর যে ঘটনা সংঘাত আজও মুক্তি সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে চলমান তা অপ্রকাশিত।



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন