Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ৩ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন সত্যব্রত মজুমদার   
আর্টিকেল সূচি
নেতাজীর হোমফ্রন্ট- ৩
পাতা 2
পাতা 3

এর আগে

সুধীর বাবুর সক্রিয় সহযোগিতায় নবপরিচিত বন্ধুদের ( টি.কে. রাও ও তাঁর সঙ্গী) নিয়ে কাজ সুরু হয়ে গেল। প্রথমেই ওদের পক্ষে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করাই মূখ্য কাজ হল। এই সব কর্মকান্ডের বিবরণ সংক্ষেপে দেওয়া হলো। সব তথ্য সংগৃহিত হলে ওরা তা নেতাজীর গোয়েন্দা দপ্তরে পাঠিয়ে দিলেন।

  • ১) ‘বিমান প্রতিরক্ষা’ যুদ্ধের একটি প্রধানতম অঙ্গ । Anglo-American প্রতিরক্ষাকে বিপর্যস্ত করতে হলে ওদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিস্ক্রীয় করে দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। বিমান প্রতিরক্ষাকে সক্রিয় রাখে বৃটেনের বিজ্ঞানীদের নব আবিষ্কার ‘রাডার সিস্টেম’ (Radar System) এবং বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য সদা পরিবর্তনশীল ‘সংকেত বার্তা’(Code)। শান্তিসুধা রায় চৌধুরী পূর্বাঞ্চলের বিমান প্রতিরক্ষার সদর দপ্তরে কর্মরত ছিলেন। তাঁকে অনেকেই তদানিন্তন সমাজ-উপযোগী মনে করতেন না। পরাধীনতার জ্বালায় তিনি নিশ্চই জ্বলছিলেন। সুযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের জীবন তুচ্ছ করে হাতে এনে দিলেন পূর্বাঞ্চলের বিমান প্রতিরক্ষার রাডার সিস্টেমের Net work এবং Code। টি.কে. রাও এবং তাঁর সঙ্গীর মাধ্যমে ওগুলো চলে গেল আজাদ হিন্দ এর Military Intelligence এর সদর দপ্তরে। পূর্বাঞ্চলের অভ্যন্তরে বিমানের অনুপ্রবেশ ও আক্রমণ এবং শত্রুর আক্রমণের প্রতিরোধ অত্যন্ত সহজসাধ্য হল আজাদ হিন্দ ফৌজের পক্ষে।
  • ২) বিমান ঘাঁটি(Air Base)-- পূর্বাঞ্চলের সবগুলো বিমান ঘাঁটির অবস্থিতি, গঠন, বোমারু ও জঙ্গী বিমান রক্ষণ ক্ষমতা, প্রতিরক্ষা ও আক্রমাণাত্মক ক্ষমতাদির সংবাদ সংগ্রহ করতে হবে। ওগুলো মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনায় আজাদ হিন্দ ফৌজের বিশেষ প্রয়োজন। ইঞ্জিনিয়ার প্রবোধ মজুমদার ও আরো ২/১ জন সহকর্মী একত্র হয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রায় সবগুলি বিমান ক্ষেত্রেই Contractor এর কাজ গুলি করছিলেন। প্রবোধবাবুর যাতায়াত পূর্বাঞ্চলের সবগুলো বিমানক্ষেত্রেই। তিনি অসীম সাহসিকতায় সমস্ত বিপেদর ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংগ্রহ করে দিলেন পূর্বাঞ্চলের বিমানক্ষেত্রগুলোর সমস্ত অভ্যন্তরীণ সংবাদ, আর সংগৃহিত তথ্য চলে গেল আজাদ হিন্দ এর Intelligence এর দপ্তরে।
  • ৩) সৈন্য সমাবেশ (Military Concentration) পূর্বাঞ্চলে কোথায় কিভাবে করা হয়েছে, তাকে কোথায় কিভাবে পুনঃবিন্যাস করা হচ্ছে, কোন ঘাঁটিতে কত সংখ্যক সৈন্য আছে এগুলোর পরিবর্তনশীলতাসহ বিস্তৃত বিবরণ মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনে সদাসর্বদাই নখদর্পণে থাকা সঙ্গত। বি-ভির কর্মীরা এবং দলের বন্ধুরা ঐ সকল তথ্য সংগ্রহ সুরু করল সারা বাংলাদেশ জুড়ে। মণিরুজ্জমান ইসলামাবাদি সাহেবও এ কাজের সাহায্যে এগিয়ে এলেন। Anglo-American সৈন্য সমাবেশের একটা সুস্পষ্ট চিত্র তৈরী হয়ে গেল অল্পদিনের প্রচেষ্টায়। বিবরণ চলে গেল যথা স্থানে।
  • ৪) নৌ চলাচলের সংবাদও আজাদ হিন্দের সদরে জানা বিশেষভাবেই প্রয়োজন। সৈন্য-রসদ-অস্ত্রশস্ত্র চলাচল অনেকটাই জাহাজ চলাচলের মাধ্যমেই হয়। বি-ভি কর্মী কমল বিশ্বাস পোর্টকমিশনারে চাকুরি করতেন। নির্দেশ অনুযায়ী বেশ কিছু জাহাজ চলাচলের সংবাদ তিনি পৌঁছে দিলেন বি-ভি দপ্তরে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পৌঁছে গেল যথাস্থানে। অন্ততঃ ছয়খানা জাহাজ মিত্র শক্তিবর্গের পূর্বাঞ্চলের সৈন্যবাহিনীকে বিপন্ন করে তলিয়ে গেল অগাধ জলে। পূর্বাঞ্চলে মিত্রশক্তির নৌচলাচল ব্যবস্থায় বিপর্যয় ঘনিয়ে এসেছিল।
  • ৫) শত্রুর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ও উৎপাদন কেন্দ্র ( Defence Production with Production Items, Production Units, etc.) গুলির বিস্তৃত তথ্য অবগতি যুদ্ধ পরিচালনে অপরিসীম ভাবে প্রয়োজন। যুদ্ধ পরিচালনে বিশেষ মুহুর্তে বিশেষ উৎপাদন কেন্দ্রের উপর আঘাত হানার প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া বাহিনীর সামরিক শক্তি নির্ধারণেও এ তথ্যগুলোর প্রয়োজন কম নয়। এ তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হলে সুকুমার লাহিড়ি, রাধাগোবিন্দ পান্ডে, জীবেশ্বর গগই, গৌরেন সেন, শিশির বসু, সুহৃদ বসু প্রমুখ ইঞ্জিনীয়ারদের সহায়তায়। তাঁরা প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে অক্লান্ত প্রচেষ্টায় যে তথ্য সংগ্রহ করে দিলেন সে তথ্যগুলোও চলে গেল যথাস্থানে। এ সব তথ্য সবই মুক্তিযুদ্ধের প্রচেষ্টায় প্রচুর সহায়ক হলো।

আজাদ হিন্দ সরকারের মুক্তিযুদ্ধের আয়োজনে যথাসাধ্য প্রয়োজন মিটিয়ে দলের সাংগঠনিক দিকে নজর দেওয়া হয়। Anglo-American সৈন্যবাহিনী পূর্ব সীমান্তে মার খেয়ে ব্রহ্ম সীমান্তে চট্টগ্রাম, মণিপুর, ডিমাপুরের রক্ষাব্যুহ পরিত্যাগ করে পাটনা-হাজারীবাগ-রাঁচির রক্ষাব্যুহে ( Defence Line) যখন Retreat করে আশ্রয় নিতে চেষ্টা করবে সে সময় অতর্কিত আঘাত হানতে হবে ওদের যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর-আঘাতের পর আঘাত হেনে বিপর্যস্ত করতে হবে ওদের, আর পলায়মান বাহিনীর ভারতীয় সৈন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে নেতাজীর আহ্বান-- ওদের করতে হবে মুক্তিপাগল।

এ কাজের জন্য এবং যথাসময়ে প্রয়োজনীয় up-surge করার জন্য প্রচুর ছোট ছোট অস্ত্র এবং বিস্ফোরকের প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ ক্ষণে বি-ভির প্রতি যে ভূমিকা গ্রহণ করার নির্দেশ ছিল তা বাস্তবে রূপায়িত করতে গেলে যে পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্রের প্রয়োজন তা ছিল না। টি.কে. রাওদেরও প্রকৃত অবস্থা বুঝিয়ে বলা হল। ওঁরা মিলিটারী ইনটেলিজেন্স এর লোক, বুঝতে কোন অসুবিধাই হলো না। ওঁদের অনুরোধ করা হলো Small arms & Explosives আজাদ হিন্দ ফৌজের কাছ থেকে আনিয়ে দেওয়ার জন্য। ওঁরা এখানকার প্রয়োজন নিয়ে আজাদ হিন্দের সদর দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে জানালেন যে প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র তাঁরা এখানে পৌঁছে দিতে প্রস্তুত অবশ্য যদি বি-ভি জিনিসগুলো গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। অনেক আলোচনা ও চিন্তাভাবনার পর ঠিক হলো আজাদ হিন্দ বাহিনীর তরফ থেকে জিনিসগুলো প্লেনের সাহায্যে সুন্দরবনে পূর্বনির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত যায়গায় নামিয়ে দিতে। প্রথমত এগুলো সাবমেরিণে আনার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু চিন্তাভাবনার পর সিদ্ধান্তে আসা গেল যে সাবমেরিণে ওগুলো আনা সম্ভব নয়। স্থান নির্বাচিত হয় সুন্দরবনে রায়মঙ্গল নদীর মোহনায় গভীর জঙ্গলের মধ্যে। পরিমল রায় চৌধুরী ও প্রবোধ সরকারের সহায়তায় সুন্দরবনে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাজ করা হয়। (ক্রোড়পত্র ‘ঞ’) প্রবোধ সরকার মাছধরা নৌকায় সুন্দরবনে রায়মঙ্গলের মুখে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান কাজ চালান। সুন্দরবনের গহীনে, রায়মঙ্গলের গভীরে অস্ত্র গ্রহণের স্থান নির্বাচন করা হয়। স্থানটি নির্বাচনে জলের গভীরতা এবং জঙ্গলাকীর্ণ পারিপার্শিকের ভূমিকা বিশেষ বৈশিষ্টপূর্ণ ছিল। বন্ধু আজাদ হিন্দের টি.কে. রাও ও তাঁর সঙ্গীর সঙ্গে স্থির হয়েছিল যে রাত্রির গভীরে অস্ত্রশস্ত্রগুলি আকাশ থেকে নামিয়ে দেবে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে। নির্দিষ্ট স্থানেও নির্ধারিত সময়ে স্থানটি চিহ্নিত থাকবে বিশেষ ধরণের আলোক সংকেতে। অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ হবে Water-proof Metallic Container এ । Leak proof এই Metallic Container গুলির সঙ্গে যুক্ত থাকবে লম্বা ‘কর্ড’, যে কর্ডের প্রান্তদেশে থাকবে ফাওতা (Float), বিশেষ ধরণের আলোক সংকেত ব্যবস্থা সহ। Container গুলো air-drop হলেই Float এর আলোক নির্দেশনা সুরু হবে এবং সে সঙ্কেত অনুসরণ করে container গুলো উদ্ধার করে সংগঠনের হেফাজতে সরিয়ে ফেলা হবে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে যে Anglo-American Air Force এর Eastern Region এর সমস্ত গোপন তথ্য আজাদ হিন্দের সদর দপ্তরে পৌঁছানয় Anglo-American Air Defence বাস্তবে অকেজো হয়ে যায়। ফলে আজাদ হিন্দ এর তরফে জাপান Air Force এর পক্ষে সুন্দরবনের যে কোন স্থানেই অনুপ্রবেশ সম্ভব ছিল। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম এগিয়ে চল যথারীতি।



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন