Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
নেপথ্যে প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন চিরঞ্জয় দাস   
আর্টিকেল সূচি
নেপথ্যে
পাতা 2
পাতা 3

গিরিধারীলালের বয়স বত্রিশ। উচ্চব্রাহ্মণ। উচ্চশিক্ষিত। সেদিন উজ্জৈনী বাড়িতে আসার পর থেকে মীরা দেবী এই মেয়েটির সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। এক ছেলে গোঁ ধরেছে বিয়ে করে সংসারী হবে না। কত লোক নিজে থেকে সম্বন্ধ করতে চাইছেন। সেদিনই তো মিশ্রজীর কন্যা রাগেস্বরীর জন্য সম্বন্ধ করতে চেয়ে ওদের কুলপুরোহিত বৈষ্ণব দাসজি এসেছিলেন। কুষ্টিবিচার করে তিনি দেখেছেন সাক্ষাৎ রাজযোটক। তবু গিরি আজ নয় কাল নয় করে চলেছে। সেই ছেলে যদি নিজে কাউকে পছন্দ করে তো ভালোই তো। তাছাড়া উজ্জৈনী মেয়েটিকে দেখতেও বেশ। যেন পার্বতী মা! এসব কথাই পড়শী রজনী বেহেনকে বলেছেন মীরা দেবী।


উজ্জৈনী গিরিধারীকে ভালোবাসে। এই দুটি মাস ধরে সে জেনেছে গিরিকে ছেড়ে সে বাঁচবে না। এই বাড়িতে গিরি বার কয়েক এসেছেও। বাবার সাথে খুব জমেও ওর। বাবাও কি পছন্দ করে না? নিশ্চয় করেন। সেদিনই তো একরাশ প্রশংসা করলেন গিরিধারীর। এমনকী গতসপ্তাহে তিনি হঠাৎ এসে বল্‌লেন,
- জৈ তোর শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তোর বিয়ে ঠিক করে এলাম।
- মানে। আমি বিয়েই করবো না কখনো। বলেছিল উজ্জৈনী।
- সচ্‌ বাত তো বেটি। বাবার মুখে হাসির আভা।
- সচ্‌ সচ্‌ সচ্‌।
- ঠিক হ্যায়। তো গিরিধারীর মা কে বলতে হবে যে আমার মেয়ে বলছে বিয়ে করবে না।
- ঈশ্‌। আমি কি তাই বলেছি্ লজ্জায় রাঙা হয়ে বেড়িয়ে গেছিলো উজ্জৈনী।
হো হো করে হেসে উঠেছিলেন মুকুন্দলাল।


সেই বাবা কিভাবে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে গ্রেফ্‌তার করে গিরিকে? যে ছেলে একটা ফড়িং কে আঘাত করতে পারে না সে ঘটাবে বিস্ফোরণ!


পঞ্জাবে বিস্ফোরণের পর পুলিশের তল্লাশি অভিযানে বেশ কিছু দুষ্কৃতি ধরা পড়ে। পর পর কিছু রাজ্যে ব্যবহৃত বিস্ফোরণের সরঞ্জাম এবং পদ্ধতির মধ্যে ফুটে ওঠা স্পষ্ট আভাস পুলিশের চোখ এড়ায়নি। পুলিশের জালে আটক দুষ্কৃতীদের ক্রমাগত জিঞ্জাসাবাদ করে যেটুকু জানা যায় এবং চেহারার বিবরণ অনুযায়ী কম্পিউটার কৃত একটা ছবি থেকে বিস্ফোরণের প্রধান নেতার একটা অবয়ব ফুটে উঠলেও তার ঠিকানা বা আশ্রয়ের কোন হদিস মেলেনি। সেই ছবি দেখে চিরুনি তল্লাশি অভিযান শুধু পঞ্জাবেই থেমে না থেকে তা পাশের রাজ্যগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী রাজ্যের আতঙ্ক উত্তর প্রদেশেও সঙ্ক্রমিত হলে এখানে প্রতিটি শহরে পুলিশ প্রহরা বেড়ে যায়, বিশেষ করে মন্দির শহর বেনারসে। হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে প্রহরারত কিছু পুলিশ গিরিধারীলালকে বেশ কদিন লক্ষ্য করে, এমনকি বাড়ি পর্যন্ত। কম্পিউটার বর্ণিত চিত্রের সাথে বেশ কিছু তারতম্য থাকলেও আদলটা যে অনেকটাই এক। এই ছবির ওপর আরো কিছু কাটাকুটির পর যেন গিরিধারীলালের মতোই কেউ বেড়িয়ে আসে। ছবি অনুযায়ী গিরিধারীর একগাল দাড়ি বা মাথায় টুপি কিছুই নেই এবং মুখটাও বেশ বয়স্ক। সঙ্গে সঙ্গে পঞ্জাব পুলিশে খবর যায়। তারপর গিরিধারীলালকে গ্রেফ্‌তার করা হয়।


শীতের রাতের চাঁদটার একাকিত্ত্ব যেন নিজের মধ্যেও অনুভব করতে পারছেন মুকুন্দলালজী। আজ ঠান্ডা কত হবে? বোধহয় বছরের শীতলতম দিন। মেয়ের সাথে আজও খাওয়ার সময় একটাও কথা হয় নি। এই সময় স্ত্রী সরলা কাছে থাকলে ভালো হতো। সে এখন দিল্লীতে কন্‌ফারেন্সে। জৈ কিছুতেই বুঝতে চাইছে না এই গ্রেফ্‌তার করা ছাড়া তার উপায় ছিলো না। গিরিধারী যে সন্ত্রাসবাদী তা তিনিও বিশ্বাস করেন না। তেমন কোনো প্রমাণ না থাকলেও ছবিটা এতোটা মেলে কি করে? ছেলেটাকে খুব পছন্দ ছিল তাঁর। জৈয়ের তো বটেই। সরলারও। এ বাড়িতেও তো আসতো। কথাবার্তা মার্জিত ধরণের। যখন জীপে তোলা হচ্ছে তখন প্রায় কেঁদে ফেলে বলেছিলো, ‘আমার কি দোষ স্যার?’ সন্ত্রাসবাদীরা ইমোশনাল হয় নাকি?


এদিকে ওপরতলার হুকুম। এইরকম দেশের অবস্থা। আতঙ্কগ্রস্ত। কোন ঝুঁকি নেওয়াও যায় না। মনজিৎ সিং-এর পাঠানো ফাইলগুলোতে বিস্ফোরণের বর্ণনা, আটক সন্ত্রাসবাদীদের বর্ণনায় এই আড়ালের নেতা যে একজনই তা বেশ বোঝা যায়। বিস্ফোরণের প্রকৃতিগুলোও এক ধাঁচের। কিন্তু ঐ ছবিটার সাথে গিরিধারীর মিলই সব ওলোটপালোট করে দিলো।


পাহাড়ের এই গ্রামটা একটা আদিবাসীদের বসতি। ঝিলিক নদীর বুকে পায়ের পাতাডোবা জল কাচের মত পরিষ্কার। এপারে গ্রাম আর ওপারে জঙ্গলের গাছপালার থেকে মাঝে মাঝে বহুদুর থেকে গুলির শব্দ আসে। নিশ্চয় শিকারের।


আবু রিয়াদকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। জঙ্গলের এই তাঁবুটা মনুষ্য বসতি থেকে মাইল দুয়েক ভিতরে। এখানে চুপিসারে নতুনদের বন্দুক শিক্ষার সাথে চলে অস্ত্র সংযোজন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে আসা কালাশণিকভ। মোহাম্মদ রাজার ডাকা এই জরুরি মিটিং-এ এত রাতেও সব জিহাদী প্রায় উপস্থিত। হাসান আলম, আবদুল্লা, আব্‌দুল, আলি, হালিম সকলেই আবু রিয়াদের দিকে চেয়ে। সিদ্দিকি, এই জিহাদী দলের নেতা বেনারসে ধরা পড়েছে। সিদ্দিকি, প্রায় বছর তিনেক গোঁড়া হিন্দুর ছদ্মবেশে দেবধামে। সেখানকার ডিআইজিটার থেকে প্রায় এই দু’মাসে অনেক তথ্য যোগার করেছে। নিরাপত্তার ফস্‌কা গেড়ো দিয়ে ছক কেটে বারাণসীতে ঢুকে পড়েছে চার জিহাদি। এবার তাদের লক্ষ্য দেবধাম কাঁপিয়ে দেওয়া। সিদ্দিকি বছরে বার তিনেক এখানে আসে। এই দেশে পুলিশের মধ্যে কতজন যে জিহাদীদের কত তথ্য দিয়ে চলেছে সরকার টেরও পায় না। এই যে পঞ্জাবে এত বড় বিস্ফোরণ তারা ঘটালো, কার সাহায্যে?


এই প্রচন্ড শীতে দেওয়ালে কাঁপতে থাকা মশালের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই একটা বুদ্ধি মাথায় এসে যায় রিয়াদের। সিদ্দিকি ছাড়াও আরও যে দুজন ধরা পড়েছে তারা কেউ এখানকার নয়। শহস্র ছড়িয়ে থাকা জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে কোনো একটার। সেটা পঞ্জাবের। তারা কেউ সিদ্দিকিকে চাক্ষুষ দেখেনি। শুধু এই সংগঠনের ইস্তাহারে সিদ্দিকির যে ছবি থাকে সেটা দেখে থাকবে। সে ছবি সাত-আট বছরের পুরোনো। সেখানে ওর একগাল দাড়ি, মাথায় টুপি। এখনকার সাথে তার কোনো মিল নেই। তবু পুলিশগুলো ওকে ধরলো কি করে?


সুতরাং যে বর্ণনা তারা দিয়েছে তা নিশ্চয় সাত আট বছরের পুরোনোটাই। এই ছবিছাড়া সিদ্দিকির কোনো তথ্যই পুলিশের জানা নেই। এটা তো পুলিশেরই বেশ উঁচু পদের একজন বলেছে।


এইসব ভাবতে ভাবতেই রিয়াদ ঠিক করে ফেলে কি করতে হবে।

গিরিধারীলালের মনে হলো মহাদেবজী মুখে চেয়েছেন। সকালে খবরটা পেয়েও সে বিশ্বাস করতে পারে নি। মুকুন্দজী নিজে তাকে খবর দেন যে ভুল সন্দেহে তাকে হেনস্থা করা হয়েছিলো। এর জন্য তিনি লজ্জিত। আসল লোক শ্রীনগরে ধরা পড়েছে। গিরিধারীলাল মুকুন্দজীকে বলেছেন,
- না মুকুন্দজী। আপনার কাজ আপনি করেছেন। আপনার কি দোষ।

আবু রিয়াদের মাথার দাম কি টাকায় হিসেব করা যাবে? সিদ্দিকিকে ছাড়াতে তিনি যে মোক্ষম চালটা দিলেন তাতেই উল্টে গেলো পুলিশ। তার কথাতেই ঠিক হয় সেইদিন বৈঠকের পর সিদ্দিকির ছোটভাই রেহানকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এতে তার জান গেলেও পরোয়া নেই। জিহাদীরা মৃত্যুকে ভয় করে না। সাত বছর আগের সিদ্দিকি যেন এখনকার রেহান। হুবহু এক। রেহানকে ধরলে নিশ্চয় সিদ্দিকিকে ওরা ছেড়ে দেবে!


উজ্জৈনী খুব খুশী। আজ বাবার সাথে প্রচুর কথা হচ্ছে তার। মুকুন্দলালও আনন্দে। গিরিধারীকে তিনি ঠিকই চিনেছিলেন। সে সন্ত্রাসবাদী নয়।


জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গিরিধারীর মনে হচ্ছে এইরকম তুখোর বুদ্ধি আবু রিয়াদ ছাড়া আর কারো না। লোকটা কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী হলে দেশের চেহারা বদলে দিতো। সে যে নিজে সিদ্দিকি এটা সে নিজে ছাড়া জানেন সায়রা আর আরিক। মানে মীরা দেবী আর পরেশনাথ। এরা সকলেই জঙ্গি সংগঠনের এক একটা মাথা। এখানে ছদ্মবেশী।


সে এখন মুক্ত। আর বিস্ফোরণ ঘটাতে জিহাদীরা বেনারসে ঢুকে গেছে। এসবই মুকুন্দজীর কৃপায়।


এখন থেকে যে কোনোদিন দেবধাম কেঁপে উঠতে পারে!
Comments (0) >>
Write comment

This content has been locked. You can no longer post any comment.


busy


 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন