Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
নেপথ্যে প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন চিরঞ্জয় দাস   
আর্টিকেল সূচি
নেপথ্যে
পাতা 2
পাতা 3

দুটো ঘুমের বড়ি খেয়েও সেই রাতে ঘুম হয়নি। শুধু মনে হয়েছে তাঁর ত্রিশ বছর ধরে কষ্ট অর্জিত সম্মান, পদ, যেন কেউ লহমায় ধূল লুন্ঠিত করে তাঁকে চূড়ান্ত অপমান করেছে! চিরজীবন ক্ষুরধার বুদ্ধি ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দিয়ে সব পরীক্ষায় সুনামের সাথে পাশ করে এই পরীক্ষাটিতে যে তিনি ফেলই করেছেন তাই নয় বরং এই কিংপিন তাঁকে সমাজের চোখে বেশ ভালো রকম বোকা বানিয়ে ছেড়েছে। নিস্তব্ধ শীতের রাতে নিজের নিশ্বাসের আওয়াজ শুনতে শুনতে দপ দপ করতে থাকা কপালের শিরাগুলোতে হাত বুলোতে বুলোতে পরের দিন কিংপিনকে ধরার ছক তিনি করে ফেলেন।


গিরিধারীলালের মা-বাবা দুজনেই বয়স্ক ও রোগগ্রস্ত। মীরা দেবীর তো আথ্রাইটিসের ব্যাথা কোন দিনক্ষণ মেনে শুরু হয় না। আর পরেশনাথ তো সেই সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকেই শয্যাশায়ী। সেদিন সকালবেলা সবে কুয়াশা কেটে গিয়ে রোদটা খোলা দরজার সারিপথে ঢুকে ঘরের কন্‌কনে লাল শালে বিস্তার লাভ করছিলো। বেনারসের এই সরু গলিতেও সূর্যদেবের অকৃপণতা দৃশ্যমান। উল্টোদিকের চৌবেজীর প্যাঁড়ার দোকানের ভিড়, চুরিওয়ালার হাঁক আর পথচলতি মানুষের গুঞ্জনের মধ্যেও কাশীবিশ্বনাথ মন্দিরের ঘন্টাধ্বনী কানে আসে। মীরা দেবী চাল বাছছিলেন আর তুলসীদাসজীর পদ তাঁর ঠোঁটে আপনিই উঠে আসছে। এই সময় মুকুন্দজী ও চারজন পুলিশকে ঘরে আসতে দেখে তিনি বেশ থতমত হয়ে যান। মুকুন্দজী মাঝেমধ্যে ওদেঁর বাড়ি আসেন ঠিকই তবে এই মুকুন্দজী যেন অন্য কেউ। এরপর কয়েকমূহূর্তের মধ্যে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে যায়। ওয়ারান্ট দেখিয়ে পুত্র গিরিধারীকে বিস্ফোরণে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফ্‌তার করা হয়। এর মধ্যে বাইরে বেশ কিছু লোকও জমেছে। দুই বৃদ্ধার কথায় কেউ কান দেয় নি।


এই চত্তরে শিবলালই সবচেয়ে ভালো পান বানায়। যারা এখান থেকে পান খান তারা বলেন শিবলালের হাতে জাদু আছে। এমন কি অন্যান্য পানের দোকানীরাও শিবলালের এই আধিপত্য মানে। কাল গিরিধারীকে পুলিশ গ্রেফ্‌তার করার পর থেকে এই পাড়াটিতে উত্তেজনা রয়েছে। রাধিকানাথ, দ্বারকাজী, সদানান্দজীর প্যাঁড়ার দোকানে, বলরাজের মুদির দোকান বা কিষণজীর ওষুধের দোকানে আজ রোজকার মতো ভিড় হলেও কেমন একটা থম্‌থমে ভাব রয়েছে কাল থেকে। কাল রাতে প্রচন্ড ঠান্ডায় বৃন্দাবন দাসের আখড়ায় আগুনের তাপ পোহাবার সময় দোকানীদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছিলো। প্রতাপজী, যাদবজীও ছিলেন। দুজনেই শিক্ষক। আর ছিলেন মাসিক পত্রিকা ‘সুবহা’–এর সম্পাদক রামপ্রসাদ যাদব। সকলে মিলেই সিন্ধান্ত নেন যে গিরিধারীলালকে অন্যায় ভাবে হেনস্থা করার প্রতিবাদে তারা পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবেন। মাথা নীচু করে যে হাঁটে, রাস্তায় দেখা হলেও যে সুন্দর হেসে ‘নমস্তে’ করে, পাড়ার সকলের প্রতি যার এতো সদ্ব্যবহার সে কিনা সন্ত্রাসবাদী! বছর তিনেক হলো এই পাড়ায় এসেছেন মীরাদেবীরা। দিব্যি মিশুকে মানুষ তাঁরা। এক্‌সিডেন্টের আগেও বৃন্দাবন দাসের আখড়ায় জমিয়ে আড্ডা দিতেন পরেশনাথজী। আর গিরিধারী তো বই ছাড়া কিছু বোঝেনই না। সখের মধ্যে বছরে দুতিনবার সে দেশের এদিকসেদিক বেড়িয়ে পড়ে।


আসলে ছমাস পরই পঞ্জাব আর উত্তরপ্রদেশে নির্বাচন। উত্তরপ্রদেশের সরকার সন্ত্রাসদমনে যে কিছুই করতে পারে নি তা মানুষ ভালোভাবেই জানে। একের পর এক বিস্ফোরণ ঘটে গেছে অথচ সেই দুষ্কৃতীরা ধরা পড়ে নি। তাই সরকারের অপদার্থতার মাশুল হিসেবে মানুষের ক্ষোভের আঁচ যাতে ভোটবাক্সের গায়ে না লাগে বা গদি টলিয়ে না দেয় তাই সরকার ও পুলিশবাহিনী হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠেছে দেশকে সম্পূর্ণ সন্ত্রাসমুক্ত করতে। তাই আসন্ন নির্বাচনলগ্নে কাউকে সন্ত্রাসবাদী সাব্যস্ত করে যদি কোন মামলার সমাধান করে ফেলা যায় তবে রাজনৈতিক ফায়দা হবে সরকারের। গিরিধারী এই ষড়যন্ত্রেরই শিকার বলে রামপ্রসাদজী, প্রতাপজী বা যাদবজীদের বিশ্বাস।


ঠিক করা হয়েছে গিরিধারীর প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এঁরা জনমত গঠন করবেন রাজ্যস্তরে। মহাদেবের বাহন শিবলালের দোকানের ধারে রোদ পোহাচ্ছে বসে। শিবলালের হঠাৎ খেয়াল হোলো গত দু সপ্তাহ ধরে যে ভিখারীটা তার দোকানের পাশে বাসা বেঁধেছিলো, গতকালের ঘটনার পর সে বা তার জিনিসপত্রের চিন্হমাত্র নেই আর।


চার দিন হলো কলেজে যায় নি উজ্জৈনী। গিরিধারীলাল গ্রেফ্‌তার হওয়ার পর থেকে সে এতই মুহ্যমান যে বাইরেও যাচ্ছে না বাড়ির। বাবা মুকুন্দলালের সাথেও তার কথা বন্ধ। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকস্তরে প্রথম বর্ষের উজ্জৈনীর, রসায়ণবিদ্যায় গবেষনারত গিরিধারীলালের সাথে পরিচয় প্রায় ছ’মাস হবে। ঝক্‌ঝকে সুন্দর মিষ্টভাষী গিরিধারীলালের ক্লাসের পড়া এক বর্ণও তার মাথায় না ঢুকলেও স্রেফ এই শিক্ষকটির উপস্থিতির জন্য সারাক্ষণ অপেক্ষা করে থাকতো উজ্জৈনী। পড়া বোঝার অছিলায় ক্লাসের বাইরে বা কখনো ক্যাম্পাসে গিরিধালীকে দেখতে পেলেই রসায়ণ তত্ত্বের ব্যাখ্যা চাইতো সে। কোনদিন যেন জ্বরের জন্য আসতে না পারায় সোজা ঠিকানা নিয়ে গিরিধারীর বাড়িতেই উপস্থিত হয় উজ্জৈনী। উজ্জৈনীকে দেখে বেচারা গিরির জ্বর বুঝি বেড়ে যাওয়ার উপক্রম। যাই হোক কিছু কথা, মীরা দেবীর অনুরোধে একটু মিষ্টিমুখ করে উজ্জৈনী সেদিন বাড়ি ফিরে আসে। প্রকৃতির ও সমাজের নিয়মে এর পর ‘আপনি’ পথ ছেড়ে দিয়েছে তুমিকে ওদের মধ্যে।




 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন