Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ৭ প্রিন্ট কর ইমেল
আর্টিকেল সূচি
বিসর্জন অথবা একটি মিথ্যে রূপকথা - ৭
পাতা 2

সাত
এর আগে

এবার মনে মনেই আমি এক আশ্চর্য প্রশ্নোত্তর শুরু করলাম ওদের একজনের সঙ্গে।

    -‘তোমার মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি আমি বক নম্বর এক। যতই ঠোঁট টিপে মুখ বন্ধ করে রাখো তুমি, তোমার মেমারির বন্ধ দরজাগুলো কিন্তু খুলে গেছে আমার সামনে। এবার কিন্তু তোমার সব লুকনো ইতিহাসই আমি পড়ে নেবো।’

    -‘মাছ বন্ধু, আমি নিজে থেকে এমন চুপ করে তো থাকতে চাইছি না ভাই। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি অনেক চেষ্টা করেও কথা বলতে পারছি না। চেষ্টা করছি, তবু যে নড়ছে না আমার মুখের পেশী, কিম্বা আমার ঠোঁটদুটো। তাহলে কী করে আমি শব্দ উচ্চারণ করবো বলো। আমার বুকের মধ্যে দিয়ে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে, কী ঝড় সে শুধু জানি আমি, কিন্তু আমার মুখ দেখে কি কেউ তা টের পাবে, বলো। অথচ জানো, যে দৃশ্য আমি দেখেছি, যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে, তেমন অভিজ্ঞতার পরে যে কারু হাল আমার মতোই হবে...’

মনে মনে প্রশ্নের মনে মনে উত্তর। সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনো করেও কুমীর কৃষ যেটা বুঝতে পারেনি, অক্টোপাস-জেঠুর আশীর্বাদের কল্যাণে এবার সেটাই বুঝতে চলেছি, জানতে চলেছি আমি। উত্তেজনায় গায়ের আঁশগুলো সব খাড়া-খাড়া হয়ে গেলো আমার। শুধোলাম, ‘কৃষ কুমীরের অনুমানটাই ঠিক নাকি বক-বন্ধু? মানুষদের কিছু নৃশংস কাজকর্মের ফলেই কি তোমার এই হাল নাকি! কিন্তু তোমার স্মৃতিতে পৌঁছে আমি তো দেখতে পেলাম আকাশ ভর্তি করে মস্তি মেরে তোমাদের ওড়াউড়ির দৃশ্য। এরপরে এমন কী ঘটে গেলো যে তুমি একেবারে ট্রমার মধ্যে চলে গেলে!’ গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে, ঠোঁট একটুও না নাড়িয়ে, মন থেকে মনে কথার উত্তর দিলো বক বন্ধু, ‘ওই দৃশ্যটা দিয়ে তো গল্পের শেষ নয় রে ভাই, গল্পের শুরু। হ্যাঁ, সেই সকালটাও ঠিক ছিলো আর পাঁচটা সকালের মতোই। ওড়া, মজা আর বিন্দাস লাইফ কাটানো। ঝাঁক বেঁধে সবাই মিলে ওড়ার সময় আমি আর আমার বন্ধুনী এলি উড়ছিলাম আবার একটু আলাদা আলাদা। সবার মধ্যে আছি, কিন্তু কারু মধ্যে নেই। আর সবাই ওড়ার আনন্দ যতখানি পাচ্ছিলো, এটুকু বলতে পারি, আমি আর এলি পাচ্ছিলাম তার দ্বিগুণ। এ একটা আশ্চর্য অনুভুতি গো মাছ-ভাই, এ আমি তোমায় বলে বোঝাতে পারবো না।’

    -‘তোমায় বোঝাতেও হবে না, ও আমি নিজেই বুঝেছি। এমন ঘটনা কি আমার জীবনে ঘটে না ভেবেছো? পুরো মাছেদের গ্রুপে দল বেঁধে যখন বেড়াতে বেরই, তখন আমার কাঁধের ধারটায় ঝিলমিলের কাঁধের ধারটা থাকলে যে একইরকম মজা পাই আমি নিজেও। কিন্তু হ্যাঁ- তুমি যা বলছিলে তারপর কী হলো...?’

    -‘তারপরই ঘটলো সেই দুর্ঘটনা। গাছের পাতায়, ঘাসের আড়ালে, আকাশের কোণায় কোণায় সাজানো ছিলো দু-পেয়ে হিংস্র প্রাণীর ফাঁদ। ওদের ফাঁদে ধরা পড়ে গেলো আমাদের গোটা দল। মনে হলো এই আকাশের কোথাও যেন বা একটা ছোট্ট বোতাম লুকানো ছিল। একমুহূর্তে কেউ যেন বা আঙুল রাখলো সেই বোতামে আর আমাদের সকলের মুখের হাসি বদলে অমনি হয়ে গেলো চোখের জল। আতংক। ভয়। হুটোপুটি। চেঁচামেচি। কলরব।’

এই অব্দি শোনার পরে আমি একবার চোখ তুলে তাকালাম বকটার দিকে। আচ্ছা ও কি টের পাচ্ছে যে, আমি ওর মন পড়ে ফেলছি? ও টের পাচ্ছে কি যে, ওর সঙ্গে মনে মনে সংলাপ চলছে আমার? মানে, বলতে চাইছি, এসব কিছু আসলে সত্যি সত্যি ঘটছে তো? নাকি সবই আমার কল্পনা। একটু দ্বিধা-দ্বন্ধের দোটানাতেই যেন বা পড়ে গিয়েছিলাম, এমন সময় চমকে উঠে দেখলাম, ওই বক-বন্ধুর চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো কৃষ-কুমীরের পিঠে। আর বহু-উ-উ দুর থেকে কেউ যেন আমায় বললো, - আমার জীবনের বাকি আধখানা শুনবে না?

আমি তড়ি-ঘড়ি বললাম, ‘কী যে বলো, শুনবো না মানে? বলো, তারপর কী হলো। দিগন্ত চরাচর ভরে গেলো তোমাদের গোটা দলটার আর্তচীৎকারে। এই অব্দিই বলেছো তুমি।’

‘গোটা দলটার আর্তচীৎকার বলেছি বুঝি? না গো। তার থেকে দুটো নাম বাদ দাও। আমার আর আমার বন্ধুনীর। বলছিলাম না আমরা উড়ছিলাম একটু আলাদা আলাদা-আর এভাবেই মাঝে মাঝে তৈরি করে নিচ্ছিলাম দুজনের নির্জনতার বলয়- তাতে লাভ হলো এই যে, আমরা দুজন ফস্কে বেরিয়ে গেলাম নিষ্ঠুর দু-পেয়ে প্রাণীর জালের ফাঁদ থেকে।’



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন