আমি তাকালাম। তখন আকাশে পেঁজা তুলোর মতো রোদ চুঁইয়ে চুঁইয়ে যেন নেমে আসছে জলের ভিতরে। ঠিক এমন একটা সময়ে আমি দেখলা, মাঝনদীতে নীরবে, নিথর হয়ে ভেসে যাচ্ছে একটা কুমীর। এত নিঃশব্দে ভাসছে, একপলক কেউ দেখলে ভাববে বুঝি বা পোড়াকাঠই ভেসে যাচ্ছে একটুকরো। সেই কুমীরের পিঠির ওপর পাশাপাশি বসে রয়েছে দুটো এইটুকুনি পুঁচকে সাদা বক। তারা উড়ে যাচ্ছে না, নড়াচড়া করছে না, বস্তুত কোনো দুষ্টুমির চিহ্নমাত্রই নেই তাদের মধ্যে। তারা যেন পাথর হয়ে গেছে। তারা যেন জীবন্ত নয়, তারা যেন স্ফটিকমূর্তি। কিম্বা তারা যেন খুব দক্ষ কোনো শিল্পীর হাতে অনেকক্ষণ সময়-নিয়ে-অনেক যত্ন নিয়ে বানানো কোনো নির্মাণ।
খুব গভীরভাবে যেন তারা ধ্যান করছে কোনো কিছুর, আর আমি কাছে গেলেই যেন বা সেই ধ্যানভঙ্গ হবার সম্ভাবনা। কী বলবো ওদের? চিত্রার্পিত নাকি ম্যানিকুইন!
ধ্যান ভেঙ্গে যাবার চান্স ছিলো জানি। তবু কুমীরের কাছে গিয়ে না শুধিয়ে পারি না, ‘কো গো তুমি?’ তারপর বললাম, ‘এদের দুজনকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে কোথায় চললে গো তুমি?’
কুমীরটা প্রথমে চেষ্টা করলো আমায় মোটে পাত্তা না দিতে। আমি তো এইটুকুনি পুঁচকি। আর ও হলো গিয়ে অ্যাত্তো বড়ো। পাত্তা দেবেই বা কেন। ইনফ্যাক্ট প্ল্যাঙ্কটনের থার্ড ল’-টা না থাকলে কপ্ করে আমায় বোধহয় মুখেই পুরে দিতো কুমীরটা। এখন অবশ্য কোনোরকম বেআইনি পথে হাঁটার চেষ্টা না করে চোখের ধার দিয়ে জাস্ট একটু দেখে নিলো আমায়। তারপর চলতে লাগলো, ঠিক যেমন চলছিলো এতক্ষণ, দুলকিচালে। কিন্তু আমিও কি আর এইটুকুনিতেই ছাড়ার পাত্তর? আমি ঘ্যানর ঘ্যানর করতেই থাকলা, ‘কই বললে না তো আমায়, কে তুমি আর কোথায়ই বা নিয়ে চলেছ এই বকদুটোকে?’
কুমীরটা তখন যেন নেহাৎ অনিচ্ছার সঙ্গেই মুখ খুললো। খুলে বললো, ‘আমার নাম কৃষ। ছোটবেলায় নাম ছিলো অবিশ্যি কৃষ্ণ, তারপর সব্বাইকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে বেড়াতে বেড়াতে একদিন আমি হয়ে গেলাম সুপারহিরো, আর লোকেও আমায় স্টাইল করে ডাকতে লাগলো কৃষ বলে।’ এরপর চোখ টেরিয়ে একটু নিজের পিঠের ওপর বসে থাকা বকদুটোকে একঝলক দেখার ভান করে বললো, ‘ওরাও মস্ত বিপদে পড়েছে কিনা, তাই ওদেরকে আমি উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছি।’