Image
 
Gifts: Misti | Mahabhoj | Cake
Movie: Bengali | Hindi | Satyajit
Music: Rabindra | Najrul | Adhunik
Books: Children | Pujabarshiki | Novel
উদ্যোগ প্রিন্ট কর ইমেল
লিখেছেন আইভি চ্যাটার্জী   
আর্টিকেল সূচি
উদ্যোগ
পাতা 2
পাতা 3
পাতা 4

পর্ব একঃ

ওরা দুই বন্ধু। সন্তু আর বুড়ো । ওদের দুটো ভাল ভাল নামও আছে। সন্তুর নাম রাজর্ষি ওর অধ্যাপক মা ছেলের মধ্যে একই রাজা আর ঋষিকে প্রত্যক্ষ করার স্বপ্ন দেখে ছিলেন সেই সুদূর অতীতে। সেই মা রোজ সন্তুর স্কুলের ছুটির সময় হাত ধরে আস্তে আস্তে হেঁটে ছোট সেই একতলা স্বপ্নের বাড়িটায় ফিরতেন। বাড়ির সামনে ছিল রুমালের মত ছোট একটা সবুজ লন। রোজই সন্তু সেই ঘাসের মাটিতে বসে পড়ত ক্লান্ত হয়ে । মা আদর করে ঘরে নিয়ে যেতেন, রোজ খাইয়ে দিতেন গল্প বলে -- রূপকথার গল্প, বীরত্বের গল্প, বড় বড় মানুষদের গল্প। তারপর ঘুম পাড়িয়ে দিতেন, আবার সন্ধ্যেবেলায় পড়তে বসা। বাবা থাকতেন অনেক দূরের এক শহরে। ছুটিতে আসতেন, মা তখন আলো-আলো মুখে ঘুরতেন, বাবাই তখন রোজ সন্তুকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। গরমের ছুটিতে ওরা যেত বাবার কাছে -- তারপর বেড়াতে যেত একসঙ্গে । কখনো পাহাড়ে, কখনো সমুদ্রে।

সেবারও বেড়াতেই গিয়েছিল মুসৌরী। তিন দিন ছিল মুসৌরীতে--রোজ বেড়াত খুব, একদিন কেম্পটি ফল্‌স দেখতে যাওয়া হল, ফেরার সময় সারা চড়াইটা সন্তু বাবার কোলে চেপে ফিরল । সেদিন ওরা দেরাদুনে নেমে আসবে -- যাবে হরিদ্বার। সেই দিনের ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনায় বাবা-মা একসঙ্গে পাড়ি দিলেন অচিন দেশে--সন্তুকে একলা রেখে দিয়ে। সন্তুকে দেখার লোকের অভাব হল না অবশ্য । সন্তুর বাবা-মা দুজন মিলে অনেক টাকা রেখে গিয়ে ছিলেন। মণিমাসি আর ছোটকাকুর সেকি ঝগড়া--কে নিয়ে যাবে সন্তুকে! সুমিপিসি তো সন্তুকে দেখলেই জড়িয়ে ধরে ‘দাদা গো’ বলে একচোট কেঁদে নেয়। সব্বাই সন্তুকে বলে, ‘তুই এক মাস আমার কাছে আয়।’

ছোটকাকু অবশ্য জোর ছাড়লেন না, ‘সন্তু আমাদের বংশের ছেলে। দাদাবৌদি নেই, ওর সব দায়িত্ব আমার।’ কি কষ্ট যে হয়েছিল সন্তুর-- শহর ছেড়ে স্কুল ছেড়ে সব স্মৃতি ফেলে রেখে কাকুর বাড়ি যেতে। সেখানের স্কুলে ভর্তি হল সন্তু, প্রতি ছুটিতে মণিমাসির বাড়ি, কিংবা মিষ্টিকাকিমার বাড়ি, না হয় সুমিপিসি-সোনামাসির বাড়ি--সবমিলিয়ে এমন ব্যস্ত রইলো সন্তু যে, একটু কাঁদতে পর্যন্ত পেল না । কবে থেকে যে ঠিক সম্পর্কগুলোতে টান ধরতে লাগল, সন্তু জানে না। সন্তুর শুধু মনে পড়ে, স্কুল থেকে একপেট খিদে নিয়ে বাড়ি ফিরে দেখত খাবার নেই, কাকিমা দরজা বন্ধ করে ঘুমোচ্ছেন, ডাকতে ভয় পেত সন্তু।

মণিমাসি বলত, ‘টিনার পরীক্ষারে সন্তু, তাই আর এবার তোকে আনালাম না।’
সুমিপিসি বলত, ‘আপদে বিপদে গিয়ে দাদার কাছে দাঁড়াতাম, এমন কপাল - সেই দাদাই নেই। আর কারো সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে ইচ্ছে করে না।’
সোনাপিসি বলত, ‘সন্তুটার যা গোঁ,আমি টিটোকে ওর সঙ্গে মিশতেই দেব না।’
মিষ্টিকাকিমারা তো সব ছুটিতে বেড়াতে চলে যেতে লাগল, সেই নিয়েও এ বাড়ির কাকিমার সন্তুর ওপরই রাগ, ‘আমারই সব দায় তো -- পাবার বেলায় সবাই -- করার বেলায় সব দায় আমার। এই ঘরের লোকটাই তো যত নষ্টের গোড়া । সোহাগ করে নিয়ে এসে নিজের ঘাড়ে তোলা!’

সন্তু যে তখনই টিউশনি করে কলেজে পড়ছে, সেই টাকা থেকেই রিমির জন্যে চকোলেট, কাকিমার জন্যে হাতব্যাগ কিনে আনছে সে নিয়ে কেউ কিছুই বলে না। সন্তুও কোনদিন জানতেই পারল না বাবা-মা ওর জন্যে টাকাপয়সা কি রেখে গেছেন। সবসময় শোনে, ‘ঐ তো দুটো কড়ি, আর আমার মাথায় এত বোঝা। সারাজীবন আমাকেই টানতে হবে।’
দেওয়া-নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কের বাঁধন - এই কথাটা সেই বয়সে বুঝেই কি সব সম্পর্কের টান চলে গেল!
কে জানে!
ঐ বুড়োর সঙ্গে বা অত ভাব হল কবে থেকে ।
বুড়োরও একটা ভাল নাম আছে-শোভন। তবে ওদের নাম জিজ্ঞেস করবেই বা কে! পাড়ায় ঢুকতে দেখলেই তো লোকে বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। কেউ তো শুনিয়েই বলে--‘পাপ, পাপ, পৃথিবীর ভার সব।’
বুড়োর মা মেয়েদের স্কুলে ঘন্টা বাজানোর কাজ করেন। ঐ স্কুলেই বুড়োর বাবা হিসেব রাখার কাজ করতেন। অসময়ে পাড়ি দিতে মা ঐ কাজ পান। মা মাঝে মাঝেই বুড়োর মাথায় হাত রাখেন, ‘ও বুড়ো, লেখাপড়াটা ছেড়েদিলি বাবা?’
সন্তুকেও বলেন, ‘ও সন্তু, কি হয়ে যাচ্ছিস দুজনে! ও বুড়ো, একটু মায়া হয় না তোদের! হ্যাঁ রে, একটু ভাববিনা তোরা?’



 

প্রতিবেশী ওয়েবজিন